এলমে-মারেফত
#ফানাবাফানাফিল্লাহকি?
নিচে আলোচনা করা হলো-
ফানা আরবী শব্দ যার অর্থ বিনষ্ট হওয়া,বিলীন হওয়া ইত্যাদি। প্রচলিত অর্থ ফানা বলতে --নিজের আমিত্ব কে বিসর্জন দেয়া বা কোন কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়াকে বুঝায়।
প্রতিটা মানুষের ভিতরেই আল্লাহর একটুকরা নূর সুপ্ত রয়েছে।যিনি সাধনা করে নফস বা জীবাত্মা কে সম্পূর্ণরুপে পরমাত্নার নিয়ন্ত্রনে এনে উক্ত নূরকে জাগ্রত করতে পেরেছেন,তিনিই আল্লাহর নিকট থেকে নির্দেশ পেয়ে থাকেন।ঐ অবস্থায় বান্দা আল্লাহতে বিলীন বা একাকার হতে সক্ষম। এর প্রমান হচ্ছে--হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ ফরমান,
"আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার এত নিকটবর্তী হয়ে যায় যে,আমি তাকে ভালোবাসতে বাসতে তার কান হয়ে যাই,যে কান দ্বারা সে শোনে,চক্ষু হয়ে যাই,যে চক্ষু দ্বারা সে দেখে,হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে,পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে হাটে। অবশ্য যখন কোন বিষয়ে প্রার্থনা করে,তখন মাত্র উহা দান করে থাকি এবং কোন বিষয়ে ক্ষমা চায়, তখন মাত্র উহা মাফ করে থাকি।"
(--বোখারী--)
প্রতিটা মানুষের আত্না একদিন আল্লাহর নূরের সাথে মিলিত অবস্থায় ছিল। আবার তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্যই স্বাভাবিকভাবে মানুষের আত্নার আকাঙ্ক্ষা। যেমন--সাগরের পানি জলীয়বাস্প হয়ে উড়ে বরফ আকারে পাহাড়ে জমা হয়। পরে গলে ঝরনাধারা রুপে নদীতে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সাগরের সাথে মিলিত হয়। যে পানি যাত্রাপথে কোন ডোবা, পুকুর বা জলাশয়ে বন্ধ হয়ে আটকা পড়ে যায়,তারপক্ষে সাগরে মিলিত হওয়া কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন কোন প্লাবনে উক্ত ডোবা,পুকুরসহ লোকালয় প্লাবিত হয়ে যায়, তখনই কেবল আটকা পড়া পানির পক্ষে নদীবাহিত হয়ে সাগরের সাথে মিলিত হওয়া সম্ভব হয়। অনুরুপভাবে আল্লাহ্ থেকে আগত মানুষের আত্না যতক্ষন পর্যন্ত পুনরায় আল্লাহতে বিলীন হতে না পারে,ততক্ষন পর্যন্ত তার সাধনা সমাপ্ত হবে না।
আল্লাহ্তে বিলীন হলে মানুষ যে কি মহাশক্তিধর হয়, তা পবিত্র কোরানের বর্ণনা থেকেই বুঝা যায়। এরশাদ হয়েছে--
"হে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!আপনি বালি নিক্ষেপ করেন নি ঐ বালি স্বয়ং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করেছেন।"
বদরের যুদ্ধে কাফেরদের প্রতি রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালি নিক্ষেপ করেছিলেন। অথচ আল্লাহ্ বলেন মোহাম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নন তিনিই (আল্লাহ্) এই বালি নিক্ষেপ করেছিলেন। অর্থাৎ ঐ সময় রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে ফানা বা বিলীন ছিলেন।এ সম্পর্কএ আমাদের জ্ঞান সীমিত বলে আমরা এর রহস্য বুঝতে পারি না।
পবিত্র কোরানে এরশাদ হয়েছে---
"মানুষ কেমন করে আল্লাহর অবাধ্য হয়,যখন তোমরা মৃত ছিলে,তখন তিনিই তোমাদের জীবিত করেছেন,আবার তোমাদের মৃত্য দেওয়া হবে, পুন:রায় তোমাদের জীবিত করা হবে। অত:পর তোমরা তার দিকেই ফিরে আসবে।"
(সূরা বাকারা,আয়াত ২৮)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ থেকে বুঝা যায়,আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট মানুষ সাধনা করে মানুষ যতক্ষন পর্যন্ত তার সাথে পুনরায় মিলিত হতে না পারবে, ততক্ষন সে চিরমুক্তি লাভ করবে না। আল্লাহ প্রাপ্ত সাধকের অভিজ্ঞাতালব্ধ বিশ্লেষনে ফানা সূফীদের সাধনার একটি অতি উচু স্তরের নাম। যে স্তরে সাধক গভীর সাধনার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব কে আল্লাহতে বিলিন করে দিয়ে একাকার হয়ে আল্লাহর গুনে গুনী হতে সক্ষম,উহাকে ফানাফিল্লাহ বলে।
সাধনার পথে সাধকগনকে ফানার ৩টি স্তর অতিক্রম করিতে হয়। যথা:
ফানা ফিশ শায়েখ
ফানা ফির রাসূল
এবং ফানাফিল্লাহ।
প্রত্যেকটি ফানাকে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।যেমন:
সাধারন ফানা
আদর্শ ফানা
মোকাম্মেল ফানা।
সে অনুযায়ী ফানা ফিশ শায়েখ এর ৩ টি স্তর হলো--
সাধারন ফানা ফিশ শায়েখ
আদর্শ ফানা ফিশ শায়েখ
মোকাম্মেল ফানা ফিশ শায়েখ।
সাধারন ফানা ফিশ শেখ অর্জন হলে আপন পীর সাহেব উনার কথা স্মরন হওয়া মাত্রই সাধকের কান্না আসবে। এ অবস্থার আরো উন্নতি হলে আদর্শ ফানা ফিশ শায়েখ অর্জিত হয়। তখন সাধক যে দিকে তাকাবে সে দিকেই আপন পীর সাহেব উনার সম্মানিত চেহারা মুবারক সামনে দেখতে পায়। এ অবস্থার আরো উন্নতি হলে সাধক মোকাম্মেল ফানা ফিশ শায়েখ এর স্তরে পৌছে যায়। এ অবস্থায় সাধক নিজের চেহারা এবং আপন পীর সাহেব উনার মুবারক চেহারা একই চেহারা দেখিতে পায়।
এ স্তরে পৌছালে পীর সাহেব উক্ত মুরীদকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার মুবারক নুরুল মাগফিরাত বা হাত মুবারকে তুলে দেন। তখন তার ফানা ফির রাসূল হাসিল হয়। ফানা ফির রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ৩ টি স্তর যথা:---
সাধারন ফানা ফির রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আদর্শ ফানা ফির রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এবং মোকাম্মেল ফানা ফির রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।
সাধক যখন সাধনা করে ফানা ফির রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্জন করে, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার নাম মুবারক শুনা মাত্রই তার কান্না আসতে থাকে। এ থেকে আর এক ধাপ অতিক্রম করে সাধকের আদর্শ ফানা ফির রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাছিল হয়,তখন সে যে দিকে তাকায় সে দিকেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র চেহারা মুবারক দেখিতে পায়। এ অবস্থায় সাধক সাধনা করতে করতে আরো এক স্তরে চলে যায়,যাকে মোকাম্মেল ফানা ফির রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে। এ অবস্থায় সাধক নিজের চেহারা এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার চেহারা মুবারক একই দেখিতে পায়। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ আশেককে আল্লাহর কুদরতি হাত মুবারক এ তুলে দেন। তাকে ফানাফিল্লাহ বলা হয়।
ফানাফিল্লাহ স্তরে সাধক মারেফতের এমন উচ্চ স্তরে পৌছে যায় যে তাকে আল্লাহ হতে পৃথক করা সম্ভবপর হয় না। ফানা ফিল্লাহর ৩ টি স্তর রয়েছে।
সাধারন ফানা ফিল্লাহ
আদর্শ ফানা ফিল্লাহ
মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ।
সাধারন ফানা ফিল্লাহর স্তরে সাধক পৌছালে আল্লাহর নাম শুনা মাত্রই কান্না করিতে থাকে। সাধনার মাধ্যমে যখন সাধক আর একধাপ এগিয়ে যায়,তখন তার আদর্শ ফানা ফিল্লাহ হাসিল হয়। এ অবস্থায় সাধক যে দিকে তাকায় সে দিকে ই আল্লাহর কুদরতি চেহারা মুবারক দেখতে পায়। পবিত্র কোরানে পাকে এ প্রসংগেই আল্লাহ এরশাদ মুাবরক করেন--
"ফাআইনামা তুয়াল্লু ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লাহ।"
অর্থাৎ তুমি যে দিকেই তাকাও সেদিকে আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ প্রেমিক সাধক যখন সাধনা করতে করতে আরো একটি স্তর অতিক্রম করে তখন তাকে মোকাম্মেল ফানা ফিল্লাহ বলে। এ অবস্থায় সাধক নিজের চেহারা কে আল্লাহর চেহারার সাথে একাকার দেখতে পায়।
সাধক হযরত মনছুর হাল্লাজ রহমতুল্লাহি আলাইহি এ স্তরে পৌছেই আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে বলেছিলেন--
"আনাল হক"। এর রহস্য বুঝতে না পেরে শরীয়তের বিচারে তাকে হত্যা করা হয়।