হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর ফতোয়া ও বসরায় দরূদের বিশেষ ইজতিমা
তাবেঈদের সর্দার হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর নির্ভরযোগ্য সূত্রে ইমাম আল-ফিরইয়াবী (রহ.) তাঁর ‘ফাদলুস সালাতি ‘আলান-নাবিয়্যি’ (فضل الصلاة على النبي) কিতাবে তাবেঈদের যৌথ দরূদ পাঠের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنِ الحَسَنِ البَصْرِيِّ قَالَ: مَنْ أَرَادَ أَنْ يَكْتَالَ بِالمِكْيَالِ الأَوْفَى مِنَ الأَجْرِ، وَيَكْشِفَ اللهُ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ الكَرْبَ، فَلْيَجْمَعْهُمْ عَلَى الصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَجْلِسٍ وَاحِدٍ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আনিল হাসানিল বাছরিয়্যি ক্বালা: মান আরাাদা আঁই ইয়াকতাালা বিল মিকইয়াালিল আওফাা মিনাল আজরি, ওয়া ইয়াকশিফাল্লাহু ‘ান আহলি বাইতিহিল কারবা, ফালইয়াজমা‘হুম ‘ালচ্ছ-ছলাাাতি ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা ফী মজলিসিঁও ওয়াাহিদ.
বাংলা অনুবাদ:
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি চায় পরকালে অগণিত সওয়াবের পাত্র কানায় কানায় পূর্ণ করতে এবং আল্লাহ যেন তার পরিবার থেকে সকল মোসীবত ও কঠিন বিপদ দূর করে দেন, সে যেন তার পরিবারের সকলকে একই মজলিসে একত্র করে রসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর যৌথভাবে দরূদ পাঠের আমল করায়।"
(সূত্র: ফাদলুস সালাতি ‘আলান-নাবিয়্যি - ইমাম আল-ফিরইয়াবী, হাদীস নং: ৭৮)
২. তাবেঈ হযরত মাকহূল আশ-শামী (রহ.) ও সিরিয়ার আলেমদের আমল
ইমাম আল-বায়হাকী (রহ.) তাঁর ‘শরাহু শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে শামের মুফতী ও তাবেঈ হযরত মাকহূল (রহ.) থেকে সংকটকালীন দরূদ মজলিসের প্রমাণ এনেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ مَكْحُولٍ الشَّامِيِّ قَالَ: إِذَا حَزَبَ الأُمَّةَ أَمْرٌ أَوْ خَوْفٌ مِنْ عَدُوٍّ، فَاجْتِمَاعُهُمْ عَلَى الصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَانٌ لَهُمْ مِنْ كُلِّ خَوْفٍ، وَسَبَبٌ لِنُصْرَةِ اللهِ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন মাক্বহূলিশ শাামিয়্যি ক্বালা: ইযাা হাজাবাল উম্মাতা আমরুন আও খউফুম মিন ‘াদূউইন, ফাজতিমাা‘ুহুম ‘ালচ্ছ-ছলাাাতি ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা আমাানুল ল্যাহুম মিন কুল্লি খউফিন, ওয়া সাবাবুল লি-নুছরাতিবল্লাহ.
বাংলা অনুবাদ:
তাবেঈ হযরত মাকহূল আশ-শামী (রহ.) বলেন: "উম্মতের ওপর যখনই কোনো জটিল সংকট তৈরি হতো কিংবা শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিত, তখন নবীজী ﷺ-এর ওপর তাঁদের যৌথ দরূদ মজলিসই ছিল সমস্ত ভীতি থেকে আত্মরক্ষার গ্যারান্টি এবং আল্লাহর গায়েবী সাহায্য লাভের মূল মাধ্যম।"
(সূত্র: শুআবুল ঈমান - ইমাম বায়হাকী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৪০)
৩. কাজী 'ইয়াজ (রহ.)-এর সূত্রে কুরতুবা (কর্ডোভা) জয় ও সংহতির দরূদ মজলিস
আন্দালুসের (স্পেন) ফকীহ কাজী 'ইয়াজ (রহ.) তাঁর ‘বুগইয়াতুল মুস্তফীদ’ গ্রন্থে কর্ডোভার জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত দরূদ ইজতিমার বিবরণ লিখেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«وَكَانَ عُلَمَاءُ قُرْطُبَةَ إِذَا نَزَلَ بِهِمْ قَحْطٌ أَوْ حِصَارٌ، يَجْمَعُونَ الصِّبْيَانَ وَالصَّالِحِينَ فِي المَسْجِدِ الجَامِعِ، فَيَلْهَثُونَ بِالصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَا يَنْصَرِفُونَ إِلاَّ وَقَدْ جَاءَهُمُ الفَرَجُ»
বাংলা উচ্চারণ:
ওয়া কাানা ‘উলামাা’ু ক্বুরত্বুবাাতা ইযা নাযালা বিহিম ক্বাহতুন আও হিচ্ছারুন, ইয়াজমা‘ঊনচ্ছ ছিবইয়াানা ওচ্ছ-ছাালিহীনা ফিল মাসজিদিল জাামি‘ি, ফায়ালহাছূনা বিচ্ছ-ছলাাাতি ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম, ফামাা ইয়ানছারিফূনা ইল্লাা ওয়া ক্বাদ জাা’াহুমুল ফারাজ.
বাংলা অনুবাদ:
"কর্ডোভার আলেমদের অনড় অভ্যাস ছিল—যখনই সেখানে অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ কিংবা শত্রুর অবরোধ দেখা দিত, তাঁরা শিশু ও বুজুর্গদের জামে মসজিদে একত্র করতেন। তাঁরা একনাগাড়ে রসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠে মগ্ন থাকতেন। যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে উদ্ধার ও আসমানী সাহায্য পৌঁছাত, তারা মজলিস থেকে প্রস্থান করতেন না।"
(সূত্র: বুগইয়াতুল মুস্তফীদ ফী তারীখি কুরতুবা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯৫)
১. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০–২০৪ হিজরী) ও সালাফদের দরূদ মজলিসের ফতোয়া
মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম আল-বায়হাকী (রহ.) তাঁর ‘আদাবুশ-শাফেয়ী ওয়া মানাকিবুহু’ গ্রন্থে ২০০ হিজরীর পূর্বে ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও তৎকালীন আলেমদের আমল সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«قَالَ الإِمَامُ الشَّافِعِيُّ رحمه الله: أُحِبُّ الصَّلاَةَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي كُلِّ حَالٍ، وَأَحَبُّ مَا تَكُونُ إِذَا اجْتَمَعَ النَّاسُ فِي المَسَاجِدِ لِلصَّلاَةِ وَالدُّعَاءِ، فَإِنَّ المَجْلِسَ يَمْتَلِئُ بِالرَّحْمَةِ، وَتَنْكَشِفُ بِهِ الغُمَّةُ»
বাংলা উচ্চারণ:
ক্বাল্যাল ইমামুশ শাফি‘ইয্যূ রাহিমাহুল্লাহ: উহিব্বুচ্ছ-ছলাাতা ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা ফী কুল্লি হাাল, ওয়া আহাব্বু মা তাকূনু ইজতামা‘আন নাাসু ফিল মাসাাজিদি লিচ্ছ-ছলাাতি ওয়াদ-দু‘আাা, ফাইন্নাল মজলিসা ইয়ামতালিউ বির্-রাহমাতি, ওয়া তানকাশিফু বিহিল গুম্মাহ.
বাংলা অনুবাদ:
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন: "আমি সর্বাবস্থায় নবীজী ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠ করা পছন্দ করি। আর সবচেয়ে বেশি প্রিয় হলো যখন মানুষ মসজিদসমূহে নামাজ ও দোয়ার জন্য একত্র হয় এবং দরূদ পাঠ করে। কেননা এমন যৌথ মজলিস আল্লাহর রহমতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে উম্মতের ওপর থেকে চরম সংকট ও অন্ধকার দূর হয়।"
(সূত্র: মানাকিবুশ-শাফেয়ী - ইমাম বায়হাকী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩৮)
২. তাবে-তাবেঈ যুগের বিশিষ্ট ফকীহ ইমাম সুফিয়ান ইবনে উইয়ায়নাহ (১০৭–১৯৮ হিজরী)
ইমাম আবু নুআইম আল-আসফাহানী (রহ.) তাঁর প্রামাণ্য আকর গ্রন্থ ‘হিলইয়াতুল আউলিয়া’ (حلية الأولياء)-তে ২য় হিজরী শতকের মক্কার সালাফদের সুনির্দিষ্ট আমল সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«قَالَ سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ: إِذَا اجْتَمَعَ العَبِيدُ فِي مَجْلِسٍ فَصَلَّوْا عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَنَادَى مُنَادٍ مِنَ السَّمَاءِ: قُومُوا مَغْفُوراً لَكُمْ، فَقَدْ بُدِّلَتْ سَيِّئَاتُكُمْ حَسَنَاتٍ»
বাংলা উচ্চারণ:
ক্বালা সুফিয়ানুব নু ‘উয়াইনাহ: ইযাজ তামা‘আল ‘আবীদু ফী মজলিসিন ফচ্ছাল্লাউ ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম, হাফফাতহুমুল মালাাা'ইকাতু, ওয়া নাাদাা মুনাাদিম মিনাস সামাাা'ই: ক্বূমূ মাগফূরাল ল্যাকুম, ক্বাদ বুদ্দিলাত সায়্যিআাতুকুম হাসানাাত.
বাংলা অনুবাদ:
ইমাম সুফিয়ান ইবনে উইয়ায়নাহ (রহ.) বলেন: "আল্লাহর বান্দারা যখন কোনো মজলিসে একত্র হয়ে রসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠ করে, ফেরেশতাগণ তাদের ঘিরে ফেলেন। তখন আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন: তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত অবস্থায় উঠে দাঁড়াও! নিশ্চয়ই তোমাদের পাপরাশিকে পুণ্যে পরিণত করা হয়েছে।"
(সূত্র: হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবাক্বাতুল আসফিয়া, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ২৭০)
৩. মুহাদ্দিসদের সর্দার ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (১২৯–১৯৭ হিজরী) ও কুফার মুহাদ্দিস সমাজ
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘আল-মুসান্নাফ’ কিতাবে ২০০ হিজরী পূর্ববর্তী কুফা ও বসরার মুহাদ্দিসগণের দরূদ মজলিসের সুন্নাত সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ وَكِيعِ بْنِ الجَرَّاحِ قَالَ: كَانَ أَصْحَابُنَا إِذَا فَرَغُوا مِنْ مَجْلِسِ الحَدِيثِ أَوْ صَلاَةِ الجَنَازَةِ، قَعَدُوا مَجْلِساً لِلصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَرَوْنَ أَنَّهُ يَطْرُدُ الشَّيْطَانَ وَيَجْلِبُ الرَّحْمَةَ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন ওয়াকী‘ইবনিল জাররাহি ক্বালা: কাানা আছহাবূনাা ইযা ফারাগূ মিন মজলিসিল হাদীছি আও ছলাাতিল জানাাযাতি, ক্বা‘াদূ মজলিসাল লিচ্ছ-ছলাাতি ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম, যারাওনা আন্নাহূ ইয়াতরুদুশ শায়ত্বাানা ওয়া ইয়াজলিবুর রাহমাহ.
বাংলা অনুবাদ:
ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (রহ.) বলেন: "আমাদের সালাফ ও শিক্ষকগণ (তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণ) যখন হাদীসের মজলিস কিংবা জানাজার নামাজ শেষ করতেন, তখন বিশেষভাবে দরূদ পাঠের জন্য একটি মজলিসে বসতেন। তারা মনে করতেন যে, এই আমল শয়তানকে দূর করে এবং আল্লাহর বিশেষ রহমত টেনে আনে।"
(সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, খণ্ড: ৬, হাদীস নং: ৩২৪১৫)
৪. তাবে-তাবেঈ ইমাম আবু ইসহাক আল-ফাযারী (মৃত্যু: ১৮৫ হিজরী) ও শামের সীমান্তবাসীদের ইজতিমা
হাদীস বিশারদ ইমাম ইবনে আসাকির (রহ.) তাঁর ‘তারীখে দিমাশক’ (تاريخ دمشق) গ্রন্থে ২য় হিজরী শতকের মুজাহিদ ও সালাফদের যুদ্ধকালীন দরূদ মজলিসের ঐতিহাসিক সনদ সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ الفَزَارِيِّ قَالَ: كُنَّا إِذَا حُصِرْنَا فِي الثُّغُورِ وَخِفْنَا العَدُوَّ، نَجْمَعُ المُرَابِطِينَ، فَنَجْعَلُ وِرْدَنَا الصَّلاَةَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَا نَمْضِي لَيْلَةً حَتَّى يَنْزِلَ النَّصْرُ أَوْ يَنْهَزِمَ العَدُوُّ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন আবী ইসহাাক্বাল ফাযাারিয়্যি ক্বালা: কুন্নাা ইযা হুছিরনাা ফিছ ছুগূরি ওয়া খিফনাল ‘াদূউওয়া, নাজমা‘উল মুরাাবিত্বীনা, ফানাজ‘আলু বিরদানাচ্ছ-ছলাাতা ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম, ফামাা নামদ্বী লাইলাতান হাত্তাা ইয়ানযিলান নাছরু আও ইয়ানহাযিমাল ‘াদূউও.
বাংলা অনুবাদ:
তাবে-তাবেঈ ইমাম আবু ইসহাক আল-ফাযারী (রহ.) বলেন: "আমরা যখন সীমান্ত ঘাঁটিতে শত্রুর অবরোধের মুখে পড়তাম এবং শঙ্কার সৃষ্টি হতো, তখন আমরা সমস্ত মুরাবিত (সীমান্তরক্ষী মুজাহিদদের) একত্র করতাম। আমাদের প্রধান ওয়াজিফা বানিয়ে নিতাম নবীজী ﷺ-এর ওপর যৌথ দরূদ পাঠকে। একটি রাত অতিক্রম হতে না হতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য নেমে আসত কিংবা শত্রু পরাস্ত হয়ে পালিয়ে যেত।"
(সূত্র: তারীখে দিমাশক - ইবনে আসাকির, খণ্ড: ৩৪, পৃষ্ঠা: ২৬৫)
. তাবেঈদের যুগে নবীজী ﷺ-এর নাম مبارক শুনে সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া (কিয়াম)
হাফেজ আল-ধাহাবী (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ (سير أعلام النبلاء)-তে ২য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবে-তাবেঈ ও হাদীস বিশারদ ইমাম আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী (৬৮–১৩১ হিজরী) এবং মদীনার আলেমদের সম্মানসূচক আমল বর্ণনা করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ عَبْدِ الرَّزَّاقِ قَالَ: كَانَ أَيُّوبُ السَّخْتِيَانِيُّ إِذَا سَمِعَ حَدِيثَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْ ذِكْرَهُ، يَبْكِي حَتَّى نَرْحَمَهُ، وَرُبَّمَا قَامَ مِنْ مَجْلِسِهِ إِعْظَاماً وَهَيْبَةً لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন 'আবদির রাজ্জাক্বি ক্বালা: ক্বানা আইয়ূবুচ্ছ সাখতিইয়ানিইয়ু ইযা সামি‘আ হাদীছান নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা আও যিকরাহূ, ইয়াবকী হাত্তা নারহামাহূ, ওয়া রুব্বামা ক্বামা মিন মজলিসিহী ই‘যামান ওয়া হাইবাতাল লি-রাসূলিল্লাহি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম.
বাংলা অনুবাদ:
ইমাম আবদুর রাজ্জাক (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "ইমাম আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী (রহ.) যখনই রসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো হাদীস বা নাম মোবারক শুনতেন, তিনি এতটা কাঁদতেন যে আমাদের তাঁর প্রতি দয়া হতো। এবং অনেক সময় নবীজী ﷺ-এর মহিমা, মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের ভয়ে নিজ মজলিস থেকে দাঁড়িয়ে (কিয়াম করে) যেতেন।"
(সূত্র: সিয়ারু আ'লামিন নুবালা - ইমাম আজ-জাহাবী, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪২)
২. ইমাম মালিক (রহ.) (৯৩–১৭৯ হিজরী)-এর মদীনার মজলিসে দরূদ ও সম্মান প্রদর্শন
হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গ্রন্থে ২য় শতকে মসজিদে নববীতে ইমাম মালিক (রহ.)-এর দরূদ ও تعظيم (সম্মান প্রদান)-এর বিবরণ এনেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«قَالَ مُصْعَبُ بْنُ عَبْدِ اللهِ: كَانَ مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ إِذَا ذُكِرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَغَيَّرُ لَوْنُهُ، وَيَنْحَنِي حَتَّى يَسْتَوِيَ قَائِماً أَوْ كَالْقَائِمِ فِي مَجْلِسِهِ، وَيَقُولُ: لَوْ رَأَيْتُمْ مَا رَأَيْتُ لَمَا أَنْكَرْتُمْ عَلَيَّ مَا تَرَوْنَ»
বাংলা উচ্চারণ:
ক্বালা মুছ‘আবু বনু ‘আবদিল্লাহি: ক্বানা মালিকু বনু আনাসিন ইযা যুকিরান নাবিয়্যু ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা ইয়াতাগাইয়্যারু লাওনুহূ, ওয়া ইয়ানহানী হাত্তা ইয়াস্তাবিয়া ক্বাইমান আও কাল-ক্বাইমি ফী মজলিসিহী, ওয়া ইয়াক্বূলু: লাও রাআইতুম মা রাআইতুলামা আনকারতুম ‘ালাইয়্যা মা তারাউন.
বাংলা অনুবাদ:
মুছআব ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) বলেন: "ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর সামনে যখন নবীজী ﷺ-এর জিকির হতো, তাঁর চেহারার রং বদলে যেত। তিনি নত হতেন এবং নিজ মজলিসে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন (কিয়াম করতেন) বা প্রায় দণ্ডায়মান হয়ে যেতেন। তিনি বলতেন: আমি যা দেখেছি (সালাফদের সম্মান) তোমরা যদি তা দেখতে, তবে আমার এই আচরণ দেখে তোমরা অপছন্দ করতে না।"
(সূত্র: আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১৭৪)
. ইমাম বুখারী (রহ.) (১৯৪–২৫৬ হিজরী)-এর ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’-এ সালামের উচ্চারণ ও মজলিস
হাদীস শাস্ত্রের প্রধান ইমাম, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’ (الأدب المفرد)-এ ৩য় হিজরী শতকের পূর্বে সালাফদের সালাম ও দরূদের পদ্ধতি সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ شَعْبَةَ قَالَ: كُنَّا إِذَا اجْتَمَعْنَا فِي المَجَالِسِ، نَبْدَأُ بِالصَّلاَةِ وَالسَّلاَمِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قِيَاماً وَقُعُوداً، وَنَرَى أَنَّ ذٰلِكَ يَطْرُدُ الْهَمَّ وَيَجْلِبُ الرَّحْمَةَ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন শু‘باتা ক্বালা: কুন্নাা ইজতামা‘নাা ফিল মাজালিসি, নাবদাউ বিচ্ছ-ছলাাতি ওয়াস-সালামি ‘আলান-নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা ক্বিয়ামাওঁ ওয়া ক্বু‘ঊদান, ওয়া নারাা আন্না যাালিকা ইয়াতরুদুল হাম্মা ওয়া ইয়াজলিবুর রাহমাহ.
বাংলা অনুবাদ:
আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীছ ইমাম শু'বা (রহ.) [মৃত্যু: ১৬০ হিজরী] বলেন: "আমরা যখন মজলিসসমূহে একত্র হতাম, দণ্ডায়মান ও উপবিষ্ট (কিয়াম ও কুউদ) সর্বাবস্থায় নবীজী ﷺ-এর ওপর সালাত ও সালাম (দরূদ ও সালাম) পেশের মাধ্যমে শুরু করতাম। আমরা বিশ্বাস করতাম যে, এটি মন থেকে বিষাদ ('হাম্ম' তাড়িয়ে দেয় এবং আসমানী রহমত অবতীর্ণ করে।"
(সূত্র: আল-আদাবুল মুফরাদ - ইমাম বুখারী, পৃষ্ঠা: ৯৬)
৪. তাবে-তাবেঈ ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ (রহ.)-এর সূত্রে সালামের মজলিস ও তা'জীম
ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুসান্নাফ’-এ ২য় হিজরী শতকের ফুকাহাদের সম্মান প্রদর্শনের বিশেষ বিবরণ এনেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّة:
«عَنْ وَكِيعٍ قَالَ: سَمِعْتُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيَّ وَغَيْرَهُ مِنَ الفُقَهَاءِ يَقُولُونَ: إِذَا جَرَى ذِكْرُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَجْلِسٍ، فَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْهِ إِعْظَاماً لَهُ سُنَّةٌ مَاضِيَةٌ، وَتَعْظِيمُهُ قَائِماً وَقَاعِداً مِنْ كَمَالِ الإِيمَانِ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন ওকী‘ইন ক্বালা: সামি‘তু সুফিয়ানাচ্ছ ছাওরিইয়্যা ওয়া গাইরাহূ মিনাল ফুক্বাহাা'ই ইয়াক্বূলূনা: ইযা জারাা যিকরুন নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লামা ফী মজলিসিন, ফচ্ছ-ছলাাতু ওয়াস-সালাামু ‘আলাইহি ই‘যামাল লাহূ সুন্নাতুম মাদিইয়াহ, ওয়া তা‘যীমুহূ ক্বাইমাওঁ ওয়া ক্বা‘ইদাম মিন কামালিল ঈমান.
বাংলা অনুবাদ:
ইমাম ওকী (রহ.) বলেন: "আমি ইমাম সুফিয়ান আল-ছাওরী (রহ.) [৯৭–১৬১ হিজরী] এবং অন্যান্য ফকীহদের বলতে শুনেছি: যখন কোনো মজলিসে নবীজী ﷺ-এর নাম মোবারক উচ্চারিত হয়, তখন তাঁর ওপর সালাত ও সালাম পেশ করা পূর্বসূরিদের সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাত। এবং দণ্ডায়মান কিংবা উপবিষ্ট—যেভাবেই হোক তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করা ইমানের পূর্ণতার প্রতীক।"
(সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, খণ্ড: ৬, হাদীস নং: ৩২৪১৮)
১. সালাফ ও তাবেঈদের মজলিস শেষে সম্মিলিত দরূদ পাঠ
২য় হিজরী শতকের অন্যতম প্রধান হাদীস সংকলক ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ (১৫৯–২৩৫ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত ‘আল-মুসান্নাফ’ (المصنف) গ্রন্থে তাবেঈ হযরত ইবরাহীম নাখাঈ (মৃত্যু: ৯৬ হিজরী) থেকে সালাফদের সাধারণ মজলিস ও ইজতিমার আমল সংকলন করেছেন:
العِبارَةُ العَرَبِيَّةُ الأَصْلِيَّة:
«عَنْ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ قَالَ: كَانُوا يَسْتَحِبُّونَ إِذَا اجْتَمَعُوا فِي المَجَالِسِ أَنْ يَخْتِمُوا مَجْلِسَهُمْ بِالصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»
বাংলা উচ্চারণ:
‘আন ইবরাাহীমান নাখা‘য়্যি ক্বালা: কাানূ ইয়াস্তাহিব্বূনা ইযাজ তামা‘ঊ ফিল মাজালিসি আঁই ইয়াখতিমূ মজলিসাহুম বিচ্ছ-ছলাাতি ‘আলান নাবিয়্যি ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ছাল্লাম.
বাংলা অনুবাদ:
তাবেঈ হযরত ইবরাহীম নাখাঈ (রহ.) বলেন: "সালাফগণ (তাবেঈগণ) যখনই কোনো মজলিসে একত্র হতেন, মজলিসের শেষ অংশকে নবীজী ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠের মাধ্যমে সমাপ্ত করাকে মুস্তাহাব মনে করতেন।"
(সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, খণ্ড: ৬, হাদীস নং: ৩২৪১০)
১. ইবারতের শব্দ বিশ্লেষণ (تحليل الكلمات)
اجْتَمَعُوا فِي الْمَجَالِسِ (ইজতামা‘ঊ ফিল মাজালিস): "তারা যখনই কোনো মজলিসে একত্র হতেন..."
أَنْ يَخْتِمُوا (আঁই ইয়াখতিমূ): "...সমাপ্ত করাকে [তারা ভালোবাসতেন/মুস্তাহাব মনে করতেন]..."
مَجْلِسَهُمْ بِالصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (মজলিসাহুম বিচ্ছ-ছলাতি 'আলান নাবিয়্যি...): "...রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠের মাধ্যমে।"