হীলাহ্ বিবাহ এবং তার শরয়ী ফায়সালা (২)

মহান আল্লাহ পাক তিনি অন্যত্র ইরশাদ মুবারক করেন-

كَذَٰلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ

অর্থ: এমনিভাবে আমি হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনার জন্য হীলাহ্ বা হিকমত অবলম্বন করেছি (উনার ভাইকে আবদ্ধ করে রাখার জন্য) (সূরা ইউসূফ শরীফ -৭৬)

আলোচ্য আয়াত শরীফে ‘কাইদ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, হীলাহ্ বা কৌশল। হযরত ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এর দ্বারা হীলাহ এর বৈধতা প্রমাণিত। আর তার দ্বারা স্বীয় হুকুক বা অধিকার হাসিলের জন্য হীলাহ্ অবলম্বন করার বৈধতা প্রতিয়মান হয়। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনার কাজের উপর সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই তিনি তা স্বীয় জাত পাকের প্রতি নিসবত বা সম্পৃক্ত করে ইরশাদ মুবারক করেন- আমিই হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনাকে হীলাহ্ বা হিকমত করার শিক্ষা দিয়েছি। (আহকামুল কুরআন শরীফ-৩/২৫৮)

তাফসীরে মা’রিফুল কুরআন, ৫/১১৭ পৃৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, এই আয়াত শরীফে পরিস্কার ভাবে মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই হীলাহ্ বা হিকমত করাকে স্বীয় জাত পাকের প্রতি এ মর্মে নিসবত করেছেন যে, এসব কাজ মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ মুবারকে হয়েছে। বিধায় একে অবৈধ বলার কোন সুযোগ নেই। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت أبي هريرة رضي الله عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم استعمل رجلا على خيبر ، فجاءه بتمر جنيب ، فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم " أكل تمر خيبر هكذا ؟ " فقال لا ، والله يا رسول الله صلي الله عليه وسلم إنا لنأخذ الصاع من هذا بالصاعين . والصاعين بالثلاثة . فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " لا تفعل . بع الجمع بالدراهم . ثم ابتع بالدراهم جنيبا.

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রাহ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একজন ছাহাবী (হযরত সাওয়াদ ইবনে গাজিয়াহ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু) উনাকে খায়বরের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। উক্ত হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি একদিন কিছু উন্নতমানের খেজুর নিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক খিদমতে হাজির হলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, খাইবরের সকল খেজুরই কি এরকম উন্নতমানের? তিনি বললেন, জি না, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা এ ধরনের এক সা’ খেজুর নিম্নমানের দুই সা’ খেজুরের বিনিময়ে এবং দুই সা’ খেজুর নিম্নমানের তিন সা’ খেজুরের বিনিময়ে কিনে থাকি। তখন নূরে মুুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আপনারা এরূপ করবেন না। বরং নিম্নমানের খেজুরকে প্রথমে দিরহামের পরিবর্তে বিক্রি করবেন। তারপর ঐ দিরহাম দিয়ে উন্নতমানের খেজুর কিনবেন। অর্থাৎ হীলাহ্ বা কৌশল- হিকমত করবেন। (বুখারী শরীফ -২১৮০, মুসলিম শরীফ-১৫৯৩)

অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে- একদিন সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি উন্নতমানের এক প্রকার খেজুর নিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র দরবার শরীফে উপস্থিত হলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এগুলো কোথা থেকে এনেছেন? সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বললেন, আমার নিকট নিম্ন মানের কিছু খেজুর ছিল। সেগুলো দুই সা’ দিয়ে আপনার জন্য এই এক সা’ খেজুর ক্রয় করেছি। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, এটা প্রকৃতপক্ষে সুদ। আর কখনো এরকম করবেন না। তবে যদি কখনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে নিম্ন মানের খেজুরকে প্রথমে দিরহাম দিয়ে বিক্রি করবেন। অতঃপর সেই দিরহাম দিয়ে এগুলো কিনে নিবেন। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই হীলাহ বা হিকমত করার তারতীব শিক্ষা দিলেন। সুবহানাল্লাহ্! (বুখারী শরীফ- ২১৮৮, মুসলিম শরীফ- ১৫৯৪)

উল্লেখ্য যে, হীলাহ্ বা কৌশল সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা মানব জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব প্রয়োজনীয়। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম, হযরত তাবেয়ীনে ইজাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত তাবে তাবেয়ীনে ইজাম ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সবাই প্রয়োজনে হীলাহ্ বা কৌশল করেছেন। আর হীলাহ্ বা কৌশল করার পন্থা -পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন।

একদিন এক ব্যক্তি সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আযম আলাইহিস সালাম উনার নিকট হাজির হলেন। আরজ করলেন, ইয়া আমীরুল মু’মিনীন! আমি এই শর্তে আমার আহলিয়াকে (স্ত্রী) তিন তালাক দিয়েছি যে, যদি আমি আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলি, তাহলে আমার আহলিয়া তিন তালাক প্রাপ্তা হবেন। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি আপনার আহলিয়াকে এক তালাকে বাইন দিয়ে ইদ্দত অতিবাহিত করতে দিন। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর আপন ভাইয়ের সাথে কথা বলুন। অতঃপর ঐ তালাক প্রাপ্তা আহলিয়াকে পুনরায় বিবাহ করুন। তাতে আহলিয়ার (স্ত্রী) উপর তিন তালাক পতিত হওয়া ব্যতিত ভাইয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ হবে। (মাবসূত লিছ সারাখসী-৩০/১৯৮)

আল্লামা ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করা বৈধতার উপর হাদীছ শরীফ দ্বারা বিভিন্ন দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। অতঃপর বলেছেন, এসব বিষয়সমূহের বৈধতা পাওয়ার জন্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হীলাহ্ বা কৌশল করার নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন। যদি তাতে হীলাহ্ গ্রহণ করা না হত তাহলে তা নিষিদ্ধ ও হারাম হয়ে যেত।

মহান আল্লাহ পাক তিনি অবৈধভাবে নিরিবিলি অবস্থানকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। তবে তা হালাল বা বৈধ হওয়ার জন্য বিবাহের নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন। অন্যায়ভাবে কারো মাল-সম্পদ দখল করতে নিষেধ করেছেন। তবে ব্যবসা- বাণিজ্য, হাদীয়া-তোহফা লেনদেনের মাধ্যমে তা হালাল বা বৈধ করেছেন। কাজেই, যারা হালাল বা বৈধ বিষয়ে পৌঁছার জন্য সম্মানিত শরীয়তসম্মত হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করাকে অস্বীকার করে প্রকৃতপক্ষে তারা শরীয়াহ কর্তৃক প্রমাণিত হুকুম বা বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে। নাউযুবিল্লাহ! (আহকামুল কুরআন শরীফ - ৩/১৭৬)

আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যদি হালাল ও গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য হীলাহ্ বা হিকমত করা হয় তা ভালো। আর যদি কোন মুসলমানের হক নষ্ট করার নিয়তে হীলাহ্ করা হয় তাহলে তা গুনাহ্ ও অন্যায়। (ফাতহুল বারী- ১৫/৪০৪)

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, মাকরুহ ও হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং গুনাহ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে হীলাহ্ বা কৌশল করা শুধু বৈধই নয় বরং মুস্তাহাব। কিন্তু কোন মুসলমানের হক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে হীলাহ্ করা গুনাহ্ ও অন্যায়।

ইমাম মুহম্মদ ইবনুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হক বিনষ্টকারী বাতিল হীলাহ্ বা কৌশলের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার বিধান থেকে পলায়ন করা কোন মু’মিনের কাজ নয়।

ইমাম সারাখসী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যে হীলাহ্ বা উপায়ে মানুষ হারাম ও নাজায়িয থেকে বিরত থাকতে পারে অথবা হালাল কাজে উপনীত হতে পারে, তা বৈধ ও ভালো। তবে যে হীলাহ্ বা কৌশলের দ্বারা অপরের হক নষ্ট হয় কিংবা সত্যের মধ্যে সংশয় বা সন্দেহ সৃষ্টি হয় অথবা বাতিলকে হক বা সত্য বানিয়ে পেশ করা হয় তাহলে এ ধরনের হীলাহ্ নাজায়িয ও মাকরুহ। পক্ষান্তরে যে হীলাহ্ বা কৌশল সে রকম নয় তাতে কোন দোষ নেই। (মাবসূত লিস সারাখসী- ৩০/২১১)

ইকদুস সুনান ২৮/৪২৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, হীলাহ্ হচ্ছে , একটি অবৈধ পদ্ধতিকে পরিত্যাগ করে বৈধ পদ্ধতি প্রহণ করা। আর বৈধ হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করার মধ্যে কোন অনিষ্টতা নেই। সম্মানিত শরীয়ত কিংবা যৌক্তিক ভাবেও তাতে ঘৃণার কোন উপাদান নেই। তবে যদি বিশেষ কোন হীলাহ্ বা কৌশলের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদের কোন উপাদান পাওয়া যায় তাহলে তা নাজায়িজ ও হারাম।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, যেসব বৈধ হীলাহ্ দ্বারা হারাম থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং হালালকে অবলম্বন করা যায় তা ভালো ও পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে যে সব হীলাহ্ বা কৌশল দ্বারা কারো হক নষ্ট করা হয় কিংবা অসত্যকে সত্য বানিয়ে উপস্থাপন করা হয় অথবা হক বা সত্যকে সংশয় ও সন্দেহযুক্ত করা হয় তা অবৈধ ও অপছন্দনীয়।

সুন্নত মুবারক তা’লীম

পুরুষের জন্য দাড়ি ও গোঁফ রাখার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র সুন্নতী তারতীব মুবারক

গোঁফ খাটো করা মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক:

মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرتْ أَبي هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ‏ اَلْفِطْرَةُ خَمْسٌ أَوْ خَمْسٌ مِنَ الْفِطْرَةِ ـ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَنَتْفُ الإِبْطِ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ফিতরাত অর্থাৎ মানুষের জন্মগত স্বভাব পাঁচটি- (পুরুষের জন্য) খৎনা করা, (নাভীর নিচের পশম কাটার জন্য) ক্ষুর ব্যবহার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও গোঁফ খাটো করা। (মুসলিম শরীফ, মুসনাদে আহমদ শরীফ)



মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

قَالَ حَضْرَتْ أَنَسٌ رَضِيَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ وَتَقْلِيمِ الأَظْفَارِ وَنَتْفِ الإِبْطِ وَحَلْقِ الْعَانَةِ أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً.‏

অর্থ: হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন- গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়িয়ে ফেলা এবং নাভীর নীচের লোম ছেঁচে ফেলার জন্যে আমাদেরকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, আমরা যেন তা চল্লিশ দিনের অধিক দেরি না করি। (মুসলিম শরীফ)



গোঁফ খাটো করার নিয়ম:

গোঁফ রাখা খাছ সুন্নত মুবারক। উপরের ঠোটের দাগ বা রেখা বরাবর গোফ রাখতে হবে। গোঁফ ভ্রু পরিমান লম্বা রাখতে হয়। এর চেয়ে বড় রাখা মহাসম্মানিত মহাপবিত্র সুন্নত মুবারক উনার খিলাফ। আর গোঁফ চেছে ফেলা বা চেছে ফেলার ন্যায় ছোট করা কোনক্রমেই উচিত নয়। এটা খারেজীদের লক্ষণ।



দাড়ি লম্বা করা মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক:



সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে পুরুষের জন্য কমপক্ষে একমুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয। এক মুষ্টি হওয়ার পূর্বে দাড়ি কাটা বা ছাটা সকলের ঐকমত্যে হারাম ও কবীরা গুনাহ। আর দাড়ি কাটাকে জায়িয মনে করা কুফরী।

সুতরাং দাড়ি কেটে বেদ্বীন-বদদ্বীনদের ছূরত ধারণ করা কোনো মতেই জায়িয হবে না। বরং হারাম ও কবীরা গুনাহ হবে।

মানুষের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার দেয়া আকৃতি বিকৃত করা সম্পূর্ণ হারাম। আর দাড়ি ও গোঁফ কেটে ফেলার কারণে যেহেতু পুরুষের আকৃতির বিকৃতি ঘটে, সেহেতু পুরুষের জন্য তার দাড়ি এক মুষ্টি হওয়ার পূর্বে কাটা সম্পূর্ণ হারাম।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “দশটি অপকর্মের কারণে হযরত লূত্ব আলাইহিস সালাম উনার ক্বওম ধ্বংস হয়েছে, তন্মধ্যে দাড়ি কর্তন করা ও গোঁফ লম্বা করাও ছিল।”

হাফিজুল হাদীছ শাহ সূফী হযরত মাওলানা রুহুল আমীন বশিরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ফতওয়ায়ে আমীনিয়াতে লিখেন- “এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয। আর ফরয তরক করা হারাম।”

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনারা যেহেতু দাড়ি মুবারক রেখেছেন তাই আমভাবে তা খাছ সুন্নত মুবারক, কিন্তু আহকামের দিক দিয়ে পুরুষের জন্য কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয। কেউ কেউ ওয়াজিবও বলেছেন। তবে যাঁরা ওয়াজিব বলেছেন, উনারা ফরয অর্থেই ওয়াজিব বলেছেন।

ফিক্বাহ শাস্ত্রবিদগণ এ মর্মে একমত যে, এক মুষ্টির কমে দাড়ি কাটা বা ছাঁটা জায়িয নয় বরং হারাম।

নীমদাড়ি:

নিচের ঠোঁট ও থুতনীর মধ্যবর্তী ছোট ছোট দাড়িকে নীমদাড়ি বলে। অনেকে বলে থাকে, নীমদাড়ি কেটে ফেললে কোন গুণাহ হবেনা। সম্মানিত শরীয়ত উনার হুকুম মুতাবিক উক্ত নীমদাড়ি কাটাও বিদয়াত ও মাকরূহ তাহরীমী। নীমদাড়ি কেটে ফেলাকে জায়িজ মনে করা কুফরী।

বুখারী শরীফ উনার শরাহ ‘ফয়জুল বারী’ কিতাবে রয়েছে, ঠোঁট ও থুতনীর মধ্যবর্তী কেশ নীম দাড়ির অন্তর্ভুক্ত। তা কাটা ও ছাঁটা নিষেধ অর্থাৎ হারাম।

মূলকথা হলো- সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে পুরুষের জন্য কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ফরয। এক মুষ্টি হওয়ার পূর্বে দাড়ি কাটা বা ছাঁটা হারাম ও কবীরা গুনাহ। আর দাড়ি কাটাকে জায়িয মনে করা কুফরী।

ঘটনা থেকে শিক্ষা

একমাত্র খালিছভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যই ইবাদত করতে হবে

সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি একবার এক ইহুদীর সাথে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একে একে তিনদিন জিহাদ করার পরে ইহুদীকে পরাস্ত করে তাকে মাটিতে শোয়ালেন এবং ইহুদীর গর্দানে তরবারী চালানোর ইচ্ছা করলেন। সে মুহূর্তে সেই ইহুদী সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার চেহারা মুবারকের দিকে থুথু নিক্ষেপ করলো। আর তখনই হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইহুদীকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এতে ইহুদী আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো যে- হুযূর! আপনি একে একে তিন দিন জিহাদ করে অনেক কোশেশ করে, আমাকে যমীনে শোয়ালেন। আর আমি আপনার শরীর মুবারকে থুথু নিক্ষেপ করার সাথে সাথে আমাকে ছেড়ে দিলেন। এর কারণ কি? সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল আউওয়াল কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, “তোমার থুথু নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তিন দিনই খালিছভাবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্যই তোমার সাথে জিহাদ করেছি। যখনই তুমি আমার গায়ে থুথু নিক্ষেপ করলে, তখনই আমার মধ্যে গোস্সা পয়দা হলো। গোস্সা নিয়ে আমি যদি তোমার সাথে জিহাদ করি, তবে তা মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য হবে না, বরং তা হবে আমার গোস্সার কারণে। তাই আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি।”

উপরোক্ত ঘটনা থেকে সহজেই অনুমেয় যে, হাক্বীক্বীভাবে কামিয়াবী হাছিল করতে হলে কতটুকু ইখলাছ হাছিল করা আবশ্যক। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمَا اُمِرُ‌وا اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُـخْلِصِينَ.

অর্থ: “তাদেরকে নির্দেশ করা হয়েছে- তারা যেন একমাত্র খালিছভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যই ইবাদত করে।” (পবিত্র সূরা বাইয়্যিনাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ-৫)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সকলকে হাক্বীক্বী ইখলাছ হাছিল করে মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার সম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অর্থাৎ উনাদের সন্তুষ্টি, রেজামন্দী মুবারক হাছিল করার তাওফিক দান করুন।

আল্লাহওয়ালা হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আদব রক্ষা করা আবশ্যক

নামাযের ক্বিবলা কা’বা শরীফ উনার দিকে থু থু নিক্ষেপ করা আদবের খেলাফ, যা তাছাওউফ বা মহান আল্লাহ পাক উনাকে হাছিল করার পথে অন্তরায়। তাই একবার কুতুবুল আলম, সুলত্বানুল আরেফীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি শুনতে পেলেন যে, অমুক স্থানে একজন কামিল মুর্শিদ আছেন, যিনি একজন বিশিষ্ট বুযূর্গ ব্যক্তি। সুলত্বানুল আরেফীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য রওয়ানা হলেন। তিনি উক্ত বুযূর্গ ব্যক্তির দরবার শরীফ-এ উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন যে, বুযূর্গ ব্যক্তি “ক্বিবলার” দিকে ফিরে থুথু নিক্ষেপ করছে। এটা দেখে সুলত্বানুল আরিফীন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আশ্চর্য্য হয়ে বললেন, যার আদব রক্ষার প্রতি এতটুকু লক্ষ্য নেই, তার কাছে এসে আমি কি হাছিল করবো? এ কথা বলে তখনই তিনি বিদায় হলেন।

বর্ণিত আছে যে, ওলীকুল শিরোমণি হযরত সাহাল ইবনে আব্দুল্লাহ তাস্তারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পীর ছাহেব হাবীবুল্লাহ হযরত যুননূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জীবদ্দশায় কখনও কোন দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে পা বিস্তার করে বসতেন না। কারো কোন প্রশ্নের জাওয়াব দিতেন না এবং কখনও মিম্বরে আরোহণ করেননি। কিন্তু একদা হঠাৎ তাস্তার নগরে পা দু’খানি বিস্তার করে দেয়ালের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন এবং সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন- “এখন তোমাদের যা ইচ্ছা আমাকে জিজ্ঞাসা করো।”

উপস্থিত লোকেরা বললেন, হুযূর বেয়াদবী মাফ করবেন, আপনিতো ইতিপূর্বে কখনও এরূপভাবে পা ছড়িয়ে বসেননি? উত্তরে তিনি বললেন, পীর ছাহেব যতদিন জীবিত থাকেন মুরীদকে ততদিন উনার আদবের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হয়। যা প্রত্যেক মুরীদের জন্যই আবশ্যক। পরে খবর নিয়ে জানা গেল যে, ঠিক সে সময়ই হযরত যুননূন মিছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার দিদারে চলে গেছেন। (রদ্দুল মুহতার, ইরশাদুত ত্বালেবীন, তাযকিরাতুল আউলিয়া)

ছহিবু সাইয়্যিদি সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, আস সাফফাহ, আল জাব্বারিউল আউওয়াল, আল ক্বউইউল আউওয়াল, হাবীবুল্লাহ, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা

সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা বেমেছাল মর্যাদার অধিকারী (১৮৯)

لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَّرِزْقٌ كَرِيمٌ

যিনি খ্বালিক যিনি মালিক যিনি রব মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে ক্ষমা, উত্তম রিযিক, সম্মান, মর্যাদা, শান-মান মুবারক রয়েছেন। সুবহানাল্লাহি ওয়া রসূলিহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তাহলে অর্থ মুবারকটা কি হলো, এটাতো ভাষায় বলা কঠিন বিষয়। সেটাই বলা হচ্ছে যদি

إِنْ كَانَتْ سَيِّدَتُنَا حَضْرَتْ اُمُّ الْمُؤْمِنِينَ الثَّالِثَةُ الصِّدِّيْقَةُ عَلَيْهَا السَّلَامُ خَبِيثَةً, فَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَبِيثٌ، فَهُوَ كَافِرٌ

নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! যদি উনাকে সেই বিপরীতটা বলা হয় তাহলে যিনি মাহাসম্মানিত হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হয়ে যাচ্ছেন। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! কাজেই তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। সে কাট্টা কাফির। তাকে ক্বতল করতে হবে সেটাই আমি করেছি। তাকে আমি শাস্তি মৃত্যুদন্ড দিয়েছি। সুবহানাল্লাহি ওয়া রসূলিহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তাহলেতো বিষয়টা ফিকির করতে হবে উনাদের শান-মান কতটুকু। সামান্যতম চূ-চেরা করলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড, এতে কোন রেহাই নেই। এখন যমীনে মানুষ দিতে পারুক বা না পারুক, এটা জারি হোক বা না হোক পরকালে কিন্তু তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়ে গেছে। এটা থেকে সে বাঁচতে পারবে না। বাঁচার তার কোন ব্যবস্থা নেই। তাকে কঠিন শাস্তি দিতেই হবে, এতে কোন রেহাই নেই। সেটাই বলা হচ্ছে যে উনাদের শান-মান, ফাযায়িল-ফযীলত মুবারক কতটুকু? উনারা যে একক, অনন্যা। উনারা কারো মতো নন। উনারা পবিত্রতা দানকারী এবং উনাদের উপর সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ হুসনে যন পোষণ করতে হবে। এখানে চূ-চেরা, কীল-কাল করা যাবে না।

মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের সম্পর্কে কোন চূ-চেরা, কীল-কাল করা যাবে না। এখন যদি কেউ করে তাহলে কি হবে? তাদের শাস্তি হচ্ছে একমাত্র মৃত্যুদন্ড। কত মৃত্যুদন্ড? সেটা কিন্তু মহাসম্মনিত কুরআন শরীফে বলা হয়েছে। এখানে যেমন বলা হলো এই বুযূর্গ ব্যক্তি আহলে বাইতে রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শাস্তি দিলেন, বললেন। মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যে এই সমস্ত দোষত্রুটি মিশ্রিত করে তার জন্য শাস্তি হচ্ছে-

اسْتَحَقَّ عَلَيْهِ الْقَتْلَ فَقَتَلْتُهُ

সে ক্বতলের উপযুক্ত হবে, তাকে ক্বতল করতে হবে। ফয়সালা শেষ। এরপর বলা হচ্ছে কি? যিনি খ্বালিক যিনি মালিক যিনি রব মহান আল্লাহ পাক তিনি বলে দিচ্ছেন। কি বলে দিচ্ছেন, বলে দিচ্ছেন পরবর্তী সময় কতটুকু শাস্তি হবে, তার শাস্তি কতটুকু?

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا

এখানে বলা হচ্ছে, নিশ্চয়ই যারা মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের শান মুবারকে অশ্লীলতা ও অশালীনতা প্রচার-প্রসার করাকে পছন্দ করে। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!

لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

তাদের জন্য ইহকাল-পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। কত কঠিন শাস্তি?

وَاللهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.

যিনি খ্বালিক যিনি মালিক যিনি রব মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম! তিনিই শুধু জানেন তোমরা সেটা জানো না। হযরত রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার জন্য খাদ্যসহ খাঞ্জা নাযিল করার দিনে খুশি প্রকাশ না করলে এমন শাস্তি দেয়া হবে যে, সৃষ্টির কাউকে দেয়া হয়নি। এটাই যদি এরকম হয় তাহলে উনাদের শান মুবারকে কেউ চূ- চেরা, কীল-কাল করে, অপবাদ দেয়, অপপ্রচার করে তাহলে তাকে কত শস্তি দেয়া হবে? সেটা কিন্তু ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হযরত রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনারটা কিন্তু ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, এটা সম্ভব না। এতো কঠিন শাস্তি দেয়া হবে, একমাত্র যিনি খ্বালিক যিনি মালিক যিনি রব মহান আল্লাহ পাক তিনি শুধু জানেন। সুবহানাল্লাহি ওয়া রসূলিহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!

সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (৪)

পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের আলোকে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার ফতওয়া অনুযায়ী ফুটবল-ক্রিকেটসহ সমস্ত খেলাধুলাই হারাম। মাঠে গিয়ে হোক আর টিভিতে হোক সর্বাবস্থায়ই খেলা দেখা হারাম ও কবীরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিখ্যাত কিতাব, মুস্তাদরাকে হাকিম শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كُلُّ لَعِبٍ حَرَامٌ اِلَّا ثَلَاثٍ: مُلَاعَبَةُ الرَّجُلِ أَهْلَهُ وَرَمْيُهُ بِقَوْسِهِ وَتَأْدِيبُهُ فَرَسَهُ

“সর্বপ্রকার খেলা নিষিদ্ধ তিনটি বিষয় ব্যতীত- যা খেলার অন্তর্ভুক্ত নয়। (১) নিজ আহলিয়া বা স্ত্রীর সাথে শরীয়তসম্মত হাসি-খুশী করা। (২) তীর ধনুক চালনা করা। (৩) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দান করা।

“আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনে মাজাহ্ শরীফ” ইত্যাদি পবিত্র হাদীছ শরীফের কিতাবেও হযরত উকবা ইবনে আমির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে অনুরূপ পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে। তবে শব্দের কিছু তারতম্য রয়েছে।

কাজেই, খেলাধুলার ফিতনা থেকে ঈমান-আমল হিফাজত করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ-ওয়াজিব।



(ধারাবাহিক)

ইসলামে বিজাতীয় তর্জ-তরীক্বা গ্রহণ কুফরী :



ইসলাম বহির্ভুত বিজাতীয় তর্জ-তরীক্বা, নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা কোন মুসলমানের জন্য জায়িয নেই। তা কাট্টা কুফরী। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَمَنْ يَّبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

অর্থ : যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (নিয়ম-নীতি, অন্য ধর্ম) তালাশ করে, তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা আলে ইমরান শরীফ-৮৫)

অর্থাৎ মুসলমানকে কোন আমল করতে হলে, বিধর্মী ও বিজাতীয় কোন পন্থা অনুসরণ করা যাবে না বা তাদের থেকে কোন নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা যাবে না। শুধুমাত্র দ্বীন ইসলামের দলীল- পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস অনুযায়ী আমল করতে হবে।

আর এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ أَتَاهُ عُمَرُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَقَالَ : إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيثَ مِنْ يَهُودَ تُعْجِبُنَا ، أَفَتَرَى أَنْ نَكْتُبَ بَعْضَهَا، فَقَالَ: أَمُتَهَوِّكُونَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ، لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً، وَلَوْ كَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ حَيًّا مَّا وَسِعَهُ إِلا اتِّبَاعِي

অর্থ : হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, ওটার কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আপনারাও কি দ্বিধাদন্দ্বে রয়েছেন? যে রকম ইহুদী নাছারারা দ্বিধাদন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি আপনাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনিও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে উনাকেও আমার অনুসরণ করতে হতো। (মুসনদে আহমদ, বায়হাক্বী, মিশকাত)

সুতরাং, উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ হতে বুঝা গেল যে, পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস ছাড়া অন্য কোন বিজাতীয় পন্থার অনুসরণ করা হারাম।

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ এবং উনাদের ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই ছাবিত হলো যে, বিজাতীয়, বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-ছূরত কোনটাই অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবে না। কেননা, বিধর্মীরা মূলতঃ মুসলমানদের ঈমান-আমল বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিত্য নতুন ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। যার একটি হলো, বিশ্বকাপ ফুটবল বা খেলাধুলা। যা মূলতঃ বিধর্মীদেরই আবিস্কার বা তাদের উদ্ভাবিত নিয়ম-নীতি। ফুটবলের ইতিহাস ও উৎস সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা দ্বারা বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জীবনী মুবারক

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৩)

বিলাদত শরীফ: ৬০৮ খৃ: বিছাল শরীফ: ৭৪ হিজরী (৬৯৪ খৃ) বয়স মুবারক: ৮৭ বছর।

বিছাল শরীফ:

হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “আত-তারীখ” গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আমার নিকট আল-উওয়াইসি বর্ণনা করেছেন যে, উনার নিকট হযরত মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেছেন; হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বয়স মুবারক ৮৭ বছরে পৌঁছেছিল। হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি ব্যতীত অন্যান্যদের মতে তিনি ৮৪ বছর বয়সে বিছাল শরীফ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রথম বর্ণনাকেই অধিকতর সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন। (ইছাবা)

হাজ্জাজের সময় আরাফাত হতে ফিরবার সময় হাজ্জাজের একজন সিপাহী তার বিষাক্ত বর্শার নিম্নাংশ হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পায়ে ঢুকিয়ে দেয়। হাজ্জাজ তথায় গমন করে সিপাহীকে শাস্তি দানের জন্য উনার নিকট সিপাহীর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি এই বলে হাজ্জাজকে তিরস্কার করেন যে, এই পবিত্র স্থানে সিপাহীকে অস্ত্র সমেত ঢোকার জন্য কেন অনুমতি দেয়া হলো? এই বিষের ফলেই তিনি বিছাল শরীফ গ্রহণ করেন।

সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে, শুধুমাত্র ঘটনাক্রমে এমনটি হয়নি, বরং এর পেছনে হাজ্জাজের ইঙ্গিত ছিল। কারণ কা’বা শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার উপর আক্রমণ চালানোর জন্য হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হাজ্জাজকে ভীষণ তিরস্কার করেছিলেন। এতে হাজ্জাজ ক্ষুব্ধ হয়। অতঃপর তারই ইঙ্গিতে একজন সিরীয় সৈনিক উনাকে এভাবে আহত করে।

হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাসক আবদুল মালিক হাজ্জাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সাথে সংঘাতে না যাওয়ার জন্য। হাজ্জাজের কাছে এ নির্দেশ ছিল অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তাই সে এই বিকল্প পথে হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে শহীদ করে।

ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন, একবার হাজ্জাজ খুতবার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি দোষারোপ করে যে, তিনি কালামুল্লাহ শরীফের বিকৃতি সাধন করেছেন। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে উঠেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার এমন ক্ষমতা নেই এবং এমন অভিযোগ উত্থাপনের তোমারও কোন সুযোগ নেই। সাধারণ সমাবেশে এমন কঠোর প্রতিবাদ হাজ্জাজ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু প্রকাশ্যে হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সাথে কোন রকম অসৌজন্যমূলক আচরণের সাহসও তার ছিল না। তাই সে গোপন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়।

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, একদিন হাজ্জাজ এত দীর্ঘ খুতবা দিলো যে, আছরের নামাযের সময় সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বিরক্ত হয়ে বলে উঠেন, সূর্য তোমার প্রতীক্ষা করতে পারে না। যা হোক এসব কারণে হাজ্জাজ হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে সহ্য করতে পারছিল না। নাঊযুবিল্লাহ!

বিষের ক্রিয়ায় হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন শয্যাশায়ী, তখন হাজ্জাজ উনাকে দেখতে আসে। কুশল বিনিময়ের পর হাজ্জাজ উনাকে বললো, অপরাধীকে আমি চিনতে পারলে তার গর্দান নিতাম। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, সবকিছু তো তুমিই করেছ। তারপর বলছ, অপরাধীকে পেলে হত্যা করতে। মুখের উপর এমন অপ্রিয় সত্য কথা শোনার পর হাজ্জাজ চুপ হয়ে যায়।

পবিত্র মদীনা মুনাওওয়ারা শরীফে জীবনের শেষ সময়টি অতিবাহিত করার একান্ত ইচ্ছা ছিল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার। উনার মারিদ্বী শান মুবারক যখন বৃদ্ধির দিকে যেতে লাগল, তিনি দোয়া করতে লাগলেন, আয় মহান আল্লাহ পাক! আমাকে মক্কা শরীফে বিছাল শরীফ দান করবেন না। উনার পুত্র হযরত সালিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে তিনি ওছীয়ত মুবারক করেন, মক্কা শরীফে আমার বিছাল শরীফ হলে মক্কা শরীফের হারাম এলাকার বাইরে কোন এক স্থানে আমাকে দাফন করবে। যে যমীন থেকে আমি হিজরত করেছি, সেখানে সমাহিত হওয়া ভাল মনে হচ্ছে না। ওছীয়ত মুবারকের অল্প কিছুদিন পর তিনি বিছাল শরীফ গ্রহণ করেন।

বিছাল শরীফের পর লোকেরা উনার ওছীয়ত মুবারক অনুযায়ী হারাম এলাকার বাইরে উনার জিসিম মুবারক দাফন করতে চায়। কিন্তু হাজ্জাজ তাতে বাধা দেয়। সে নিজেই জানাযার নামায পড়ায় এবং ‘ফাখ’ নামক কবরস্থানে উনাকে দাফন করে। (অসমাপ্ত)

হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সত্যের মাপকাঠি

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ

অর্থ: কিন্তু মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাদের অন্তর মুবারকে সম্মানিত ঈমান উনার মুহব্বত মুবারক সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং আপনাদের অন্তর মুবারকসমূহ সম্মানিত ঈমান উনার দ্বারা সৌন্দর্যম-িত করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফরী, শিরকী, নাফরমানী ইত্যাদির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। (হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) উনারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র সূরা হুজুরাত শরীফ: আয়াত শরীফ ৭)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুমহান বুলন্দী শান মুবারক প্রকাশ: ‘উম্মী’ শব্দ নিয়ে বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচারের চূড়ান্ত জবাব (১৪)

হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি লিখেছেন তার একটি চমৎকার দলীল।



হযরত ইমাম শাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন-

عَنِ الشَّعْبِيِّ قَالَ: كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْتُبُ كَمَا تَكْتُبُ قُرَيْشُ: بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ حَتَّى نَزَلَتْ عَلَيْهِ: {ارْكَبُوْا فِيْهَا بِسْمِ اللَّهِ تَجْرِهَا وَمُرْسَهَا} فَكَتَبَ: بِسْمِ اللهِ حَتَّى نَزَلَتْ عَلَيْهِ: {قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ} فَكَتَبَ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ حَتَّى نَزَلَتْ عَلَيْهِ: {إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ فَكَتَبَ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ.

‘হযরত ইমাম শা’বী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কুরাইশদের মতো ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ লিখতেন। অতঃপর যখনارْكَبُوْا فِيْهَا بِسْمِ اللَّهِ تَجْرِهَا وَمُرْسَهَا অবতীর্ণ হলো, তখন তিনি শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ লিখতেন। অতঃপর যখন পবিত্র কুরআন শরীফের আয়াত قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ নাজিল হলো, তখন তিনি ‘বিসমিল্লাহির রহমান’ লিখতেন। অতঃপর যখন পবিত্র কুরআন শরীফের إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ নাজিল হলো তখন তিনি লিখলেন- بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।’ (তাবাকাত ইবনে সা’দ ১/২০২, মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ৩৫৮৯০নং হাদীছ)

হযরত ইমাম শা’বী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে আরেকটু বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে এভাবে-

عن الشعبي قال كتب النبي صلى الله عليه وسلم أربعة كتب كان يكتب باسمك اللهم فلما نزلت بسم الله مجريها ومرساها كتب بسم الله فلما نزلت قل ادعوا الله أو ادعوا الرحمن كتب بسم الله الرحمن فلما نزلت إنه من سليمان وإنه بسم الله الرحمن الرحيم كتب بسم الله الرحمن الرحيم قال عاصم قلت للشعبي أنا رأيت كتاب النبي صلى الله عليه وسلم فيه بسم الله الرحمن الرحيم ‌فقال ‌ذاك ‌الكتاب ‌الثالث

‘হযরত ইমাম শা’বী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ৪ খানা চিঠি লিখেছেন। যখন তিনি ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ লিখেন তখন بسم الله مجريها ومرساها নাযিল হয়। যখন ‘বিসমিল্লাহ’ লিখলেন তখন قل ادعوا الله أو ادعوا الرحمن নাজিল হলো। যখন ‘বিসমিল্লাহির রহমান’ লিখলেন তখন إنه من سليمان وإنه بسم الله الرحمن الرحيم নাজিল হলো। তখন তিনি ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ লিখলেন।

হযরত ইমাম আছেম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইমাম শা’বী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললাম, আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চিঠির মধ্যে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ দেখতে পেয়েছি। তখন তিনি বলেন, ‘এটি তৃতীয় চিঠি ছিলো’।

(মায়ানিল কুরআন লিন’নাহহাস; লেখক: আবু জাফর নাহহাস আহমদ ইবনে মুহম্মদ ৫/১২৯, ওফাত: ৩৩৮ হিজরী, তাফসীরে মাওয়ারিদী ৪/২০৬; লেখক: আবুল হাসান আলী ইবনে মুহম্মদ ইবনে মুহম্মদ ইবনে হাবীব আল বাছরী আল বাগদাদী [ওফাত: ৪৫০])

বাতিল ফিরকার লোকেরা অভ্যাস অনুযায়ী বলতে পারে মায়ানিল কুরআনের লিখক হযরত আবু জাফর নাহহাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তো কোন সনদসহ এটা বর্ণনা করেননি। তিনি কি একলাফে ইমাম আছেম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে পেয়ে গেলেন? এর কি কোন সনদ আছে?

আসুন আমরা দেখি সনদ আছে কিনা। হযরত ইবনে আবি হাতেম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন-

حَدَّثَنَا أَبُو هَارُونَ الْخَزَّازُ، ثنا عَلِيُّ بْنُ الْجَهْمِ، ثنا عُمَرُ بْنُ أَبِي قَيْسٍ، عَنْ عَاصِمٍ، عَنِ الشَّعْبِيِّ قَالَ: ‌كَتَبَ ‌رَسُولُ ‌اللَّهِ ‌صَلَّى ‌اللَّهُ ‌عَلَيْهِ ‌وَسَلَّمَ ‌أَرْبَعَةُ ‌كُتِبَ

আমার কাছে বর্ণনা করেছেন আবু হারূন আল খাজ্জাজ, তিনি বর্ণনা করেছেন আলী ইবনু জাহম থেকে, তিনি বর্ণনা করেছেন উমার ইবনু আবিল কায়েস থেকে, তিনি হযরত আছেম রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি ইমাম হযরত শা’বী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি বর্ণনা করেন- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ৪ খানা চিঠি লিখেছেন। (তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম ৬/২০৩৩; হাদীছ শরীফ: ১০৮৮৫, লেখক: হযরত ইবনে আবি হাতিম রহমতুল্লাহি আলাইহি [ওফাত: ৩২৭])

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন, “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনে আমলে ছলেহ করছেন উনারা ব্যতীত সমস্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।”

যারা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রত্যেকের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার সম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদেশ-নিষেধ মুবারক অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করে দুনিয়া হতে বিরাগ হয়ে পরকালের দিকে হাক্বীক্বীভাবে রুজু হওয়া।

ছাহিবাতু সাইয়্যিদিল আ’দাদ শরীফ, সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন, হাবীবাতুল্লাহ, ছাহিবায়ে নেয়ামত, রহমাতুল্লিল আলামীন, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম, সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যারা মহান আল্লাহ পাক উনার সাক্ষাতকে মিথ্যারোপ করেছে তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশেষে যখন তাদের কাছে হঠাৎ কিয়ামত আসবে তখন তারা বলবে, হায় আমাদের জন্য আফসোস! কারণ, আমরা এই বিষয়ে গাফিল ছিলাম (অর্থাৎ কিয়ামতের বিষয়ে চিন্তা ছেড়েই দিয়েছিলাম)। তারা তাদের পিঠে (গুনাহর) বোঝা বহন করবে। সাবধান! তারা যা বহন করবে তা কতইনা নিকৃষ্ট বা মন্দ! এই দুনিয়াবী যিন্দেগী খেল-তামাশা ব্যতীত আর কিছুই না। আর মুত্তাক্বী উনাদের জন্য পরকালের আবাস উত্তম। তবুও কি তোমরা বুঝো না?

সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, সকলকে মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট চলে যেতে হবে। এ বিষয়টিকে যারা মিথ্যারোপ করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করার অর্থ হচ্ছে, নেক আমল করা যা মালী ও জিসমানী। কারণ, মহান আল্লাহ পাক ঈমান এনে আমলে ছলেহ করতে বলেছেন। শুধু ঈমান আনলেই হবে না। যখন ঈমান উনার উপর ইস্তেকামত বা অবিচল-অটল থাকা যাবে তখন তার জন্য কামিয়াবী থাকবে। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্তের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, সূরা আসর শরীফে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনে আমলে ছলেহ করছেন উনারা ব্যতীত সমস্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থাৎ দুনিয়াতে যারা ঈমান এনে আমলে ছলেহ করবে না, পরকালে তারা গুনাহর বোঝা বহন করবে। নাঊযুবিল্লাহ! দুনিয়া আনন্দ-ফুর্তি, আমোদ-প্রমোদের জন্য নয়। বরং মহান আল্লাহ পাক তিনি দুনিয়াকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত-বন্দেগী, নেক কাজ করার জন্য। যারা ইবাদত-বন্দেগী করা থেকে বিরত থাকবে তারা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হবে। আর যারা মুত্তাক্বী উনাদের জন্য পরকালই উত্তম।

সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যারা মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে গাইরুল্লাহ মুক্ত করবেন। অর্থাৎ যারা মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করে গুনাহ তথা নাফরমানিমূলক কাজ থেকে বিরত থাকেন, উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক তিনি দুনিয়া সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে হিফাযত করবেন, দুনিয়াবী ঝামেলা থেকে মুক্ত করবেন।

সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, যখন বান্দার অন্তরে মহান আল্লাহ পাক উনার ভয় থাকবে না তখন সে গুনাহর কাজে মশগুল থাকবে আর পরকালে গুনাহর বোঝা বহন করবে।পা না ভিজিয়ে যেমন পানিতে নামা যায় না ঠিক তেমনি গুনাহ ব্যতীত দুনিয়া হাছিল করা যায় না। আর গুনাহ করলে তার শাস্তি ভোগ করতেই হবে।

সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, মূলকথা হলো- যারা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রত্যেকের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে-মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার সম্মানিত রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদেশ-নিষেধ মুবারক অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করে দুনিয়া হতে বিরাগ হয়ে পরকালের দিকে হাক্বীক্বীভাবে রুজু হওয়া।