সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার কদম মুবারকে যখন প্রথমবার আসলাম তখন জানতাম না আমার মত এই আদনা অযোগ্যের নসীব যে উনারই বরকতময় হাতে। একটা মেয়ের শিক্ষাজীবন শেষে তাকে নেককার ও উপযুক্ত পাত্রের হাতে পাত্রস্থ করা বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন দায়িত্ব। অনেক জটিলতা থাকা সত্বেও আমার জন্য সেই দায়িত্বটাই নিয়েছিলেন সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি। আজ তা মনে করে চোখ ভরে আসে অশ্রুতে!
আমার পরিবার সেসময়ে সঠিক সমঝের অভাবে দরবার শরীফের সিলসিলাভুক্ত কারো সাথে আমার বিয়ে দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি কি চান উনার সন্তানকে বদ নসীবের দিকে ছেড়ে দিতে? তাই আমার আহালের পরিবার আমাকে পছন্দ করার পর আমার পরিবার থেকে শত বাধার মুখেও সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি অবিচল ছিলেন। আজকের এই স্বার্থের দুনিয়ায় কে কাকে এক বিন্দু উপকার করে! কিন্তু তিনি যে সাধারণ কেউ নন সেটাই আমি বলতে চাই।
শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার উসীলায় অবশেষে আমার ফ্যামিলির সবাই বিয়েতে রাজি হলো। ২০০৫ সালের ২২শে মে, ১৩ই রবীউস সানী সাবতি (শনিবার) রাতে বিয়ের দিনক্ষন ঠিক করা হলো। বিয়ের আগের রাতে সুন্নতি মেহেদী সন্ধ্যার অনুষ্ঠান! বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার প্রথম ধাপ হলো মেহেদী সন্ধ্যা। এ অনুষ্ঠানই সবচেয়ে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে থাকে। যাই হোক, গায়ে হলুদ বলে কথা। সবাই তো একে অন্যকে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছিলো কিন্তু আমার মুখে হলুদের প্রথম ছোঁয়া ছিল সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার হাত মুবারকের। গায়ে হলুদ লাগানো শেষে গোসলের পালা। তিনিই বললেন চুল সিল্কি হওয়ার জন্য ডিম ভেঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে মাথায় দিতে। আহা! কি আনন্দ! এমন যত্ন বহুদিন পাইনি। এরপর হলুদ সাজ, মেহেদী লাগানো আরো কত কি! সেবার মেহেদী অনুষ্ঠানে সর্বপ্রথম তাশরীফ নিলেন দুই শাহযাদী, অবুঝ আমি উচ্ছ্বসিত মনে কাঁচা ফুলের স্টিক উনাদেরকে হাদীয়া দিলাম। উনারাও তা সাদরে গ্রহণ করলেন। সেদিনের মত শেষ হল আমার চিরস্মরণীয় জাঁকজমকপূর্ণ হলুদ অনুষ্ঠান।
পরের দিন রাতে (ইয়াওমুল ইসনাইনিল আযীম শরীফ) বিয়ে। বিয়ের যে আয়োজন তা আমার পরিস্থিতি থেকে আশা করা অসম্ভব ছিল। সম্ভব হয়েছে শুধুই আমার প্রানপ্রিয় শায়েখ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুল উমাম আলাইহিস সালাম এবং সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনাদের জন্যই। আয়োজনের শত ব্যস্ততার মাঝেও সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি নিজ পবিত্র হাত মুবারকে আমাকে কনে সাজিয়েছিলেন। উনার দেয়া সাজে আমার চেহারার গঠনে অন্যরকম একটা স্নিগ্ধতা ফুটে উঠলো!
আমার বিয়েতেই প্রথম মহাপবিত্র সুন্নতী মসজিদ এবং দরবার শরীফ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। পুরুষ-মহিলার জন্য পর্দার মধ্যে আড়ম্বর অনুষ্ঠান করা এই যুগে খুব সহজ নয়, আর আমার বিয়ে হিসেবে এ ছিল এক 'চ্যালেঞ্জ'। সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এক বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমার আত্মীয়-স্বজনরা তাদের গতানুগতিক ভাবনা নিয়ে পবিত্র দরবার শরীফে এসেছিলো। ভেবেছিল যে, 'হুযূরদের আবার কিইবা আয়োজন! সাদামাটা বিশেষত্বহীন কন্যাদান' কিন্তু বিয়েতে উপস্থিত হয়ে সবাই তো হতবাক!!! ছবি তোলা, ভিডিও করা, বেপর্দা হওয়া, গানবাজনা, নর্তন-কুর্দন ছাড়াও যে জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে তা তাদের ধারণার বাহিরে ছিলো। যারা জীবনে কখনো পর্দা করেনি তারা এখানে আসার পর যতটুকু সময় ছিলো ইচ্ছায় অনিচ্ছায় পর্দার মধ্যে অবস্থান করেছে! তাদের কাছে আরো একটি বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, একজন আল্লাহওয়ালী, পর্দানশীন মহিলা উনার পক্ষে এমন আয়োজন করাও কি সম্ভব! আত্মীয়দের মধ্যে এরকম অবমূল্যায়ন কারীদের সংখ্যা কম ছিল না। এরকমই একজন, বিয়ের অনুষ্ঠানে পরার উপযোগী পোশাক না পরে একেবারে প্রায় ঘরোয়া পোশাকে চলে এসেছিল। তারপর অনুষ্ঠানের জাঁকজমক সুন্নতী আয়োজন দেখে সে যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পড়ে, যার কারণে সে বোরকাই খুলেনি, দ্রুত অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
একটি কথা এখন প্রায়ই মনে হয়। সাজানোর সময় সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি আমার কানে দুল পরিয়ে দেয়ার সময় দুলটি হাত মুবারকে নিয়ে হাসিমাখা চেহারা মুবারকে বলেছিলেন, "তুমি অনেক বড় কপাল নিয়ে এসেছো...." এখনো যেন কান পাতলেই শুনতে পাই সেই কথা মুবারক! সেই মহামূল্যবান কথা আমি তখন বুঝে উঠিনি কিন্তু আজ যখন উনার মুবারক উসীলায় সাংসারিক জীবনে অনেক অনেক ভালো আছি তখন সেই কথারই স্মরণ করি আর অন্তর দিয়ে অনুধাবন করি, তিনি আমাকে কি অমূল্য নিয়ামত মুবারকই না দিয়েছেন!
- সাইয়্যিদাহ ফাতিমা আহমাদ পলি