যে ঘটনা দেখার পর হযরত হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাওবা করে পরবর্তীতে ওলি আল্লাহ হয়েছেন...
হযরত হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনি বড় ওলী আল্লাহ ছিলেন। প্রথম যামানায় উনি মণিমুক্তার ব্যবসা করতেন। রোম থেকে মণিমুক্তা এনে উনি বসরাতে বিক্রি করতেন। উনি একবার গেলেন সেই রোমে। রোমের এক উজিরের সাথে, এক মন্ত্রীর সাথে উনার সম্পর্ক ছিল। সেই রোমের মন্ত্রী বললো, হে হযরত হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এসেছেন ব্যবসার মাল নেয়ার জন্য, আজকে আমি আপনাকে একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যাব। একটা নতুন জিনিস দেখাব। ঠিক আছে, নিয়ে চলেন, কোথায়? নিয়ে যাওয়া হলো, অনেক দূরে একটা মাঠের মধ্যে। সেই মাঠে একটা বড় তাঁবু টাঙানো। সে তাঁবুর ভিতরে কিছু একটা রাখা হয়েছে। উনি দূর থেকে লক্ষ্য করলেন, সেই রোমবাসীদের মধ্যে রোমের বাদশাহ সেখানে গিয়েছে, তার উজির-নাজির সকলেই গিয়েছে। দেখা গেল কি, কিছুক্ষণ পরে কিছু সৈন্য-সামন্ত তাদের ঢাল-তলোয়ার নিয়ে সেই তাঁবুটাকে প্রদক্ষিণ করলো, কি যেন তারা বলতে বলতে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
দুই নম্বরে দেখা গেল- কিছু সংখ্যক আলিম, কিছু জ্ঞানীলোক তারাও সেই তাঁবুটাকে প্রদক্ষিণ করে কাঁদতে কাঁদতে, কিছু বলতে বলতে চলে গেল।
তৃতীয়তঃ কিছু বৃদ্ধলোক, তারাও সেই তাঁবুটাকে প্রদক্ষিণ করলো। কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলে তারা চলে গেল।
চতুর্থতঃ দেখা গেল- কিছু খুবছূরত মহিলা। তাদের মাথায় স্বর্ণ মণি-মুক্তার ডালা রয়েছে। সেটা নিয়ে তারা সেই তাঁবুটাকে প্রদক্ষিণ করে কিছু বলে, কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
ঘটনা শেষ। এরপরে যখন বাদশাহ স্বয়ং নিজেই সেটা প্রদক্ষিণ করে এবং সে নিজেও কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলে, সেখান থেকে বের হয়ে আসল।
যখন ঘটনাটা ঘটে গেল, হযরত ইমাম হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, সেই মন্ত্রীকে যে, হে ভাই মন্ত্রী! আমি তো তোমাদের ভাষা বুঝি না। তোমরা কি বললে, কি করলে? আমি তো কিছুই বুঝলাম না। এটা যখন বলা হলো, তখন সেই মন্ত্রী বললো- হে হযরত ইমাম হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি! মূলতঃ এখানে বাদশাহর একটা ছেলে শায়িত আছে, সে খুব উপযুক্ত ছিল। বাদশাহ মনে করেছিল, বাদশাহর পরে তাকে গদীনশীন করা হবে। কিন্তু হঠাৎ অসুখে সে মারা যায়। যখন সে মারা গেল, তখন তাকে এখানে দাফন করা হয়েছিল। এজন্য প্র্রত্যেক বৎসর তার মৃত্যুর দিন বাদশাহ আসে। আপনি যে দেখলেন- কিছুসংখ্যক সৈন্য-সামস্ত তারা কি বললো জানেন? সৈন্য-সামন্তরা তাদের ঢাল-তলোয়ার নিয়ে তারা তার কবরকে প্রদক্ষিণ করলো এবং তারা কাঁদতে কাঁদতে বললো, হে শাহজাদা! যদি ঢাল দিয়ে, তলোয়ার দিয়ে তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, তাহলে আজকে তোমাকে আমরা অবশ্যই রক্ষা করতাম সেই মৃত্যু থেকে। কিন্তু তোমাকে এমন এক অস্তিত্ব অর্থাৎ খালিক-মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীন মৃত্যু দিয়েছেন, যাঁর কাছে আমাদের ঢাল-তলোয়ারের কোন মূল্যই নেই, কোন মূল্যই নেই। কাজেই তোমাকে রেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোন পথ নেই। এই কথা বলে তারা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। এরপরে জ্ঞানী ব্যক্তিরা আসল। এসে বললো- হে শাহজাদা! যদি জ্ঞান দিয়ে, আক্বল দিয়ে, সমঝ দিয়ে তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, আমরা রক্ষা করতাম। কিন্তু যিনি তোমাকে নিয়ে গেছেন, উনার কাছে আমাদের জ্ঞান, আমাদের আক্বল সমঝ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। এই কথা বলে কাঁদতে কাঁদতে তারাও চলে গেল।
এরপর আসলো বৃদ্ধলোকেরা। তারা এসে বললো- হে শাহজাদা! যদি কান্নাকাটি করে, রোনাজারি করে, আহাজারি করে, মায়া মুহব্বত দিয়ে, তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, আমরা রক্ষা করতাম। কিন্তু যিনি নিয়ে গেছেন, তাঁর কাছে আমাদের রোনাজারি, আহাজারি, কান্নাকাটির কোনই মূল্য নেই। একথা বলে তারাও কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
এরপরে আসলো সেই মহিলারা। তারা বললো, হে শাহজাদা! যদি ছূরত দিয়ে, মাল দিয়ে তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, আমরা রক্ষা করতাম। কিন্তু যিনি নিয়ে গেছেন, উনার কাছে এগুলো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কোন মূল্যই নেই। একথা বলে তারাও কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
শেষ পর্যন্ত বাদশাহ এসে বললো, হে শাহজাদা! যদি আমার সমস্ত রাজত্বের বিনিময়ে, সমস্ত ধন-সম্পদের বিনিময়ে তোমাকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, আমি করতাম। কিন্তু আমার এই সমস্ত ধন-সম্পদ রাজত্ব, যিনি নিয়ে গেছেন, উনার কাছে কোন মূল্য নেই। কাজেই তোমাকে রেখে যাওয়া ছাড়া কোন পথ নেই। একথা বলে তারা সকলেই কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
হযরত ইমাম হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি এই ঘটনা যখন দেখলেন, দেখে উনি খুব চিন্তিত হয়ে গেলেন। উনি খালিছ তওবা করলেন, যে সত্যিই তো দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, এখান থেকে কিছুই নিয়ে যাওয়া যাবে না। ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, সম্পদ কিছুই নেয়া যাবেনা। শুধু নেয়া যাবে নেক আমলগুলি, এছাড়া তো কিছুই নেয়া যাবে না।
আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
فمن يعمل مثقال ذرة خيرايره ومن يعمل مثقال ذرة شرايره.
“যে একবিন্দু পরিমাণ নেকী করবে, সে তার বদলা পাবে। আর এক বিন্দু পরিমাণ পাপ যদি করে, সেটারও বদলা তাকে গ্রহণ করতে হবে।”
আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সবাইকে বেশি বেশি নেক আমল করার তৌফিক দান করুক। আমিন!
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম sm40.com
@highlight