মক্কার একটি মসজিদে প্রবাসী দুই বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদানের খবরটি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একদল মানুষ এই ঘটনাকে সামনে রেখে সৌদি আরবকে ‘তাওহিদ ও পূর্ণাঙ্গ শরিআহ বাস্তবায়নের দেশ’ হিসেবে তুলে ধরে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু আবেগ ও অন্ধভক্তির চশমা খুলে বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে থলের আসল বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। এখানে বাহবা দেওয়া বা আহ্লাদিত হওয়ার মতো কোনো ভিত্তি আসলেই নেই।
প্রথমত, ইসলামি শরিআহর মূল নীতি অনুযায়ী ব্যভিচার বা জিনার ক্ষেত্রে দণ্ড দুই ধরনের। অপরাধী বিবাহিত হলে তার শাস্তি পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড (রজম), আর অপরাধী অবিবাহিত হলে তার শাস্তি ১০০টি বেত্রাঘাত। আলোচ্য ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনই ছিলেন অবিবাহিত।
অতএব, এই দণ্ডকে কোনোভাবেই ইসলামি শরিআহর ‘হদ’ বা আসল বিধান বলা যায় না; এটি সর্বোচ্চ প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় বিচারিক শাস্তি (তাজির) হতে পারে। শরিআহর একটি সুস্পষ্ট বিধানের ক্ষেত্রে এমন আইনি বিভ্রান্তি তৈরি করে সেটিকে শরিআহ বাস্তবায়নের বড় সাফল্য হিসেবে চিত্রায়িত করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবকে যারা চোখ বন্ধ করে ইসলামি রাষ্ট্র বা শরিআহর মডেল মনে করেন, তারা বাস্তবতা হয়তো জানেন না কিংবা গোপন করেন । বর্তমান সৌদি আরব একটি রাজতান্ত্রিক লিবারেল রাষ্ট্র। সেখানে সুবিধাজনক জায়গায় লোকদেখানো শরিআহ আইনের ব্যবহার করা হলেও, স্বার্থ ও সুবিধামতো সেই আইনকেই উপেক্ষা করা হয়।
সৌদিতে দেশের নিজস্ব নাগরিকদের ক্ষেত্রে যখন এমন কোনো গুরুতর অপরাধ ঘটে, তখন বহু ক্ষেত্রেই তা বিচার বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছায় না। প্রশাসনিক প্রভাব, প্রভাবশালী গোত্রীয় লবিং কিংবা পেশিশক্তির জোরে পর্দার অন্তরালেই বিষয়গুলো রফা হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো তাদের বর্তমান সামাজিক নীতিতে। সৌদি আরব এখন দুবাইয়ের মতো একটি মিনি ইউরোপে পরিণত হতে চলেছে। বিনোদন ও পর্যটনের নামে নাইট ক্লাব, ওপেন কনসার্ট, মদের বারের উন্মুক্ত উপস্থিতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণকে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বেহায়ামি সেখানে চোখে পড়ার মতো।
একদিক থেকে জিনা ও অশ্লীলতার যাবতীয় উপকরণ, পরিবেশ ও সুযোগের দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে সেই একই ফাঁদে প্রবাসী মুসলিমরা পা দিলে কঠোর শরিআহ বাস্তবায়নের নাটক সাজানো হচ্ছে—এই দ্বিমুখী নীতি অত্যন্ত হাস্যকর ও হতাশাজনক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ডাটাবেজ এবং শেষ এক দশকের সৌদির বিচারিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখলে স্পষ্ট দেখা যায়, জিনা বা অনৈতিকতার অভিযোগে কোনো সৌদি নাগরিকের ওপর চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের নজির নেই! অথচ প্রবাসীদের বেলায় শরিয়াহ আইনের প্রয়োগে কালক্ষেপণ নাই!
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে রিয়াদে এক শ্রীলঙ্কান গৃহকর্মী ও এক প্রবাসীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের রায়ে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলেছিল, যা পরবর্তীতে তীব্র কূটনৈতিক চাপে কারাদণ্ডে রূপান্তর করতে বাধ্য হয় বিচারবিভাগ।
দীর্ঘ সময় পর এখন আবার দুই বাংলাদেশীর ক্ষেত্রে এই কঠোরতার প্রদর্শন কেবলই বিশ্বের কাছে ‘শরিআহ প্রতিষ্ঠার’ একটি দেখনদারি মহড়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
মূলত সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ মূল পরিস্থিতি এবং নাগরিক জীবনের ভয়ভীতি বাইরের মানুষের কাছে পৌঁছায়ই না। অতি সম্প্রতি সৌদি বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আমাদের বাংলাদেশী কজন হাজি নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটি যখন প্রবাসী মুফতি মোহাম্মদ আলি সাহেব ভিডিও করে লাইভ দেখালেন, তখনই কিন্তু তাকে সৌদি গোয়েন্দারা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেখানে চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম ও হাতে গোনা কয়েকটি অনুমোদিত মাধ্যম ছাড়া ভেতরে ঠিক কতটা ভয়, চাপ ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে মানুষ দিন কাটাচ্ছে—তা বাইরের মানুষের জানার কোনো সুযোগ রাখা হয় না।
অতএব, যে দেশে অনৈতিকতা ও পশ্চিমা সংস্কৃতি ওপেন, সেখানে প্রবাসী মুসলিমদের ক্ষেত্রে শরিআহ কায়েমের ভান করাটা সস্তা রাজনীতি ও নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়।
তাই বাংলাদেশ থেকে অন্ধের মতো সৌদি আরবকে তাওহিদের মডেল বা ইসলামি শরিআহর চূড়ান্ত কেন্দ্র ভেবে অযথা অতি-উৎসাহ দেখানো কিংবা আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সচেতন মানুষের কাছে এই দ্বিমুখী নীতির আসল রূপ আজ পুরোপুরি পরিষ্কার
লেখা সংগ্রহ