যদি আমরা হই!!!
সূরা আরাফ শরীফের ৯৬ নং আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা পেশ করা হলো -

আয়াত শরীফ

﴿ وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ﴾

অর্থ আর যদি জনপদবাসী ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো, তবে অবশ্যই আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকতসমূহের দরজা খুলে দিতাম। [সূরা আরাফ: ৯৬]

১. শানে নুযূল ও প্রেক্ষাপট

এই আয়াতের আগে আল্লাহ পাক হযরত নূহ, হূদ, ছলেহ, লূত, শুয়াইব আলাইহিমুস সালাম উনাদের ক্বওমের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা ঈমান না আনার কারণে কিভাবে ধ্বংস হয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক এই আয়াত নাযিল করে জানিয়ে দিলেন, ধ্বংসই নিয়ম নয়, বরং যদি তারা ঈমান ও তাকওয়ার পথে আসতো, তবে ফলাফল সম্পূর্ণ উল্টো হতো।

এই আয়াত হলো রহমতের নীতি — কিভাবে কোন জাতি দুনিয়াতেই জান্নাতি বরকত পেতে পারে।

২. শব্দে শব্দে হাকীকত

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا - যদি জনপদবাসী ঈমান আনতো।

এখানে آمَنُوا বলতে শুধু মুখে কালিমা পড়া নয়। মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, এখানে ঈমান বলতে ৩টি জিনিস -

- আল্লাহর উপর ঈমান
- হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ঈমান
- এবং উনার আনা দ্বীনের উপর ঈমান

وَاتَّقَوْا - এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো।

তাকওয়া মানে শুধু নামায-রোযা নয়। তাকওয়া হলো —

তাকওয়ার মূল হলো গুনাহ থেকে বাঁচা।
হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাকওয়া কী?
তিনি বললেন, আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথ দিয়ে হেঁটেছেন?
হযরত উমর বললেন, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, কিভাবে হেঁটেছেন?
বললেন, কাপড় গুটিয়ে, খুব সাবধানে হেঁটেছি যেন কাঁটা না লাগে।
তিনি বললেন, এটাই তাকওয়া। দুনিয়াটা কাঁটাযুক্ত পথ, গুনাহ হলো কাঁটা, খুব সাবধানে বেঁচে বেঁচে চলার নাম তাকওয়া।

তাকওয়ার ২টি দিক —
১. আল্লাহর আদেশ পালন করা — নামায, রোযা, হালাল রিযিক, পর্দা, সুন্নতের অনুসরণ।
২. নিষেধ থেকে বাঁচা — শিরক, কুফর, সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, গীবত, হারাম থেকে বাঁচা।

لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم - আমি অবশ্যই তাদের উপর খুলে দিতাম।

এখানে আল্লাহ পাক لَ তাকীদের জন্য এনেছেন। অর্থাৎ অবশ্যই, নিশ্চিতভাবে খুলে দিতাম। এটা আল্লাহর ওয়াদা।

بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ - আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ।

এখানে আল্লাহ পাক بَرَكَةً একবচন বলেননি, বলেছেন بَرَكَاتٍ বহুবচন। অর্থাৎ একটি দুটি নয়, অগণিত বরকত।

৩. আসমান-যমীনের বরকত কী কী?

ইমাম বাগাভী, ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহিম বলেন -

আসমানের বরকত হলো
- সময়মতো বৃষ্টি বর্ষণ
- অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি থেকে হিফাযত
- রোদের পরিমিত তাপ, চাঁদের আলো, বাতাসের ভারসাম্য
- বালা-মুসিবত, আসমানী গযব থেকে হিফাযত

যমীনের বরকত হলো
- ফসলের প্রাচুর্য, ফলে স্বাদ বৃদ্ধি
- যমীন থেকে খনিজ, রিযিক বেশি বের হওয়া
- ব্যবসায় লাভ, চাকরিতে বরকত, অল্পতে বেশি হওয়া
- নিরাপত্তা, শান্তি, মারামারি-হানাহানি বন্ধ হওয়া
- নেক সন্তান, সুস্থতা, মনে শান্তি

বর্তমান যামানার সাথে মিলিয়ে দেখুন আজ আমাদের অভাব কীসের? বৃষ্টি হয় অসময়ে, ফসল নষ্ট হয়, ব্যবসায় বরকত নেই, ঘরে শান্তি নেই, রোগ-বালাই বেশি, টাকা আছে কিন্তু সুখ নেই। এর কারণ একটাই — আমরা آمَنُوا وَاتَّقَوْا এই শর্ত পূরণ করিনি।

৪. এই আয়াত থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা

এই আয়াত আমাদেরকে একটি সূত্র দিয়ে দিলো —

যদি রিযিক, শান্তি, নিরাপত্তা চাও, তবে আমেরিকা, ইউরোপের কাছে যেও না, বরং ঈমান ও তাকওয়ার দিকে ফিরে আসো।

আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেন —
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
যে তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি। [সূরা তালাক: ২-৩]

তাকওয়া থাকলে —
- দোকানে ১০ টাকা লাভেও বরকত হবে, আর তাকওয়া না থাকলে ১০ লাখেও বরকত হবে না।
- ঘরে ১ বেলা খাবারেও শান্তি থাকবে, আর তাকওয়া না থাকলে ১০ পদেও অশান্তি থাকবে।

৫. বরকতের চাবি কে?

এই আয়াতের বরকতের দরজা খোলার চাবি হলো হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি। কারণ ঈমান ও তাকওয়া উনাকে বাদ দিয়ে হয় না।

এজন্য দেখা যায়, যে দেশে, যে ঘরে, যে দোকানে সুন্নতের আমল বেশি, দরূদ শরীফ বেশি, সেখানে আজও বরকত বেশি।

যে ব্যক্তি এই আয়াতের উপর আমল করবে — খাঁটি ঈমান আনবে, হালাল খাবে, গুনাহ থেকে বাঁচবে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত মুতাবেক চলবে — আল্লাহ পাক তার জন্য আসমান-যমীনের বরকতের দরজা খুলে দিবেন।

আল্লাহ পাক আমাদেরকে آمَنُوا وَاتَّقَوْا এর হাকীকত বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।