যেদিন বাড়িওয়ালা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “ভাই, কালকের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেবেন। আর এক মাসও অপেক্ষা করতে পারব না,” সেদিন আমি তাকে শুধু মাথা নেড়ে বলেছিলাম, “ঠিক আছে।”
কিন্তু দরজা বন্ধ করার পর আমার পা দুটো কাঁপছিল। কারণ আমি জানতাম, কালকের মধ্যে শুধু একটা বাসা নয়, আমার সন্তানদের ছোট্ট পৃথিবীটাকেও হয়তো গুছিয়ে ফেলতে হবে।
গত চার মাস ধরে আমার কোনো চাকরি ছিল না।
যে মানুষটা মাসের প্রথম সপ্তাহেই বাড়ির বাজার করে ফেলত, সে তখন বাজারে ঢুকে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে শুধু দাম দেখত। চালের বস্তা থেকে একটু কম দামি চাল, দুধের বদলে কম দামি গুঁড়ো দুধ, হরেক পদের ফলের জায়গায় শুধু কলা - কীভাবে সংসারটাকে একটু একটু করে ছোট করা যায়, হাতের টাকা ধরে রাখা যায়, সেই হিসাব করতাম প্রতিদিন।
প্রথম মাসে মনে হয়েছিল, “চাকরি তো আবার হয়ে যাবে।”
দ্বিতীয় মাসে আত্মীয়দের ফোন দেওয়া শুরু করলাম। তৃতীয় মাসে বুঝলাম, বেশিরভাগ মানুষ সহানুভূতি দিতে পারে, কিন্তু সাহায্য করতে পারে না। আর চতুর্থ মাসে এসে আমি একদমই কাউকে ফোন দেওয়া বন্ধ করে দিলাম।
কারও কাছে হাত পাততে আমার লজ্জা লাগত।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো যখন আমার ছোট মেয়েটা রাতে এসে জিজ্ঞেস করত, “আব্বু, আমাদের কি এবার ঈদের নতুন জামা হবে না?”
আমি হাসতাম।
বলতাম, “হবে তো মা। আল্লাহ চাইলে অবশ্যই হবে।”
মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলত, “আল্লাহ চাইলে মানে?”
আমি বলতাম, “মানে আল্লাহ চাইলে এমন জায়গা থেকে এনে দেবেন, যেখান থেকে আমরা ভাবতেও পারব না।”
ও তখন বিশ্বাস করে চলে যেত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেদিন আমার নিজেরই কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছিল না।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি মোবাইলের ক্যালকুলেটর খুলে বসতাম। হাতে ছিল মাত্র ১,৭৮০ টাকা। পরদিন বাড়িওয়ালাকে দেওয়ার কথা ছিল ১২ হাজার। বাসা ছাড়লে নতুন বাসার অগ্রিম লাগবে। মেয়েদের স্কুলের ফি বাকি। বাজারে দোকানদারের কাছে ধার। বিদ্যুতের বিলও জমে আছে।
সব হিসাব যোগ করার পর আমি মোবাইলটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
সেদিন রাতে আমি অনেকদিন পর তাহাজ্জুদের জন্য উঠলাম। ঘর অন্ধকার ছিল। সবাই ঘুমাচ্ছিল। আমি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে এত কাঁদলাম যে নিজের কান্নার শব্দ নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
সিজদায় গিয়ে শুধু বললাম, “ইয়া আল্লাহ, আমি মানুষের কাছে আর কিছু চাইতে চাই না। আমার সম্মানটুকু আপনি বাঁচিয়ে রাখুন। আমার মেয়েদের সামনে আমাকে এমন করবেন না যেন মনে হয় আমি বাবার দায়িত্ব পালন করতে পারলাম না।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “আমি জানি না আপনি কীভাবে করবেন। শুধু একটা রাস্তা খুলে দিন।”
না, সেদিন নামাজ শেষে কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি।
কেউ ফোন করেনি।
কোনো টাকা আসেনি।
কোনো চাকরির খবরও আসেনি।
বরং সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়িওয়ালার মেসেজ,
“দুপুরের মধ্যে জানাবেন, বাসা ছাড়বেন কবে।”
আমি মেসেজটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা রেখে দিয়েছিলাম।
মনে হচ্ছিল, হয়তো আমার দোয়া কবুল হয়নি।
সেদিন দুপুরে হঠাৎ আমার স্ত্রী বলল, “তুমি কি গত বছর ওই বয়স্ক লোকটার দোকানে গিয়েছিলে? যে কিনা চা আর পরোটা বিক্রি করত?”
আমি বললাম, “কোন লোক?”
সে বলল, “ঐ যে উনি, স্টেশনের পাশের ছোট দোকানটা চালাতেন। তুমি একদিন তার কাছ থেকে চা খেয়ে টাকা দিতে না পেরে বলেছিলে পরে দিয়ে যাবে।”
আমি কিছুই মনে করতে পারছিলাম না।
স্ত্রী বলল, “আমি মনে করতে পারছি। কারণ সেদিন তুমি বাসায় এসে বলেছিলে, লোকটা খুব কষ্টে আছে। তুমি নাকি উনাকে নিজের পুরোনো একটা শার্টও দিয়েছিলে।”
আমি হেসে বললাম, “ওসব তো কত মানুষকেই করেছি।”
আমার স্ত্রী একটু থেমে বলল, “লোকটা নাকি তোমাকে খুঁজছে।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
“আমাকে কেন খুঁজবে?”
সে জানত না। শুধু বলল, “দোকানের পাশের এক পরিচিত লোক আজ বাজারে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেছে, তুমি এখন কোথায় থাকো।”
আমি বিষয়টা খুব একটা গুরুত্ব দিইনি।
মানুষ কতজনকেই তো খোঁজে।
সেদিন বিকেলে ফোন এলো।
একটা অপরিচিত নম্বর।
আমি ধরতেই ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় একজন বললেন, “বাবা, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
লোকটা নিজেই বললেন, “স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানটা ছিল আমার।”
আমি চমকে গেলাম।
“জি… বলুন।”
তিনি বললেন, “তোমার সাথে আমার অনেকদিন আগে দেখা হয়েছিল। তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি। কিন্তু আমি তোমাকে মনে রেখেছি।”
আমি হেসে বললাম, “চাচা, কী ব্যাপার?”
তিনি বললেন, “তুমি সেদিন আমার দোকানে এসে চা খেয়ে টাকা দিতে পারোনি। যাওয়ার সময় বলেছিলে, ‘চাচা, কাল দিয়ে যাব।’ পরের দিন তুমি টাকা দিয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু তার সঙ্গে একটা শার্ট আর কিছু খাবারও রেখে গিয়েছিলে।”
আমি বললাম, “চাচা, ওই ঘটনা নিয়ে এখন…”
তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “শোনো বাবা। আমি জানি তুমি চাকরি হারিয়েছ।”
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“আপনি জানলেন কীভাবে?”
তিনি বললেন, “তোমার এক পরিচিত ছেলে আমার দোকানে আসে। সে বলেছে তোমার অবস্থা খারাপ, এতটাই যে বাসা ছাড়ার কথাও নাকি মালিক জানিয়ে দিয়েছে।”
আমি চুপ করে গেলাম।
তারপর তিনি এমন একটা কথা বললেন, যেটা শুনে আমি কিছুক্ষণ কোনো উত্তরই দিতে পারিনি।
“তুমি কাল বাসা ছাড়বে না।”
আমি ভাবলাম, হয়তো উনি মজা করছেন।
বললাম, “চাচা, আমার কিছু টাকা…”
তিনি বললেন, “আমি হয়তো অনেক টাকা নেই, বাবা। তবে তোমার বাসা ভাড়ার ছয় মাসের টাকা আমি দিয়ে দিতে পারব।”
আমি যেন ভুল শুনলাম।
“কী?”
তিনি বললেন, “আমার একটা জমি বিক্রি হয়েছে কিছুদিন আগে। কিছু টাকা হাতে আছে। আমার ছেলে বিদেশে থাকে, আমার নিজের তেমন খরচ নেই। আমি ভাবলাম, আল্লাহ হয়তো এই টাকা কারও প্রয়োজনের সময় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।”
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না।
তিনি আবার বললেন, “তবে একটা শর্ত আছে।”
আমি বললাম, “কী শর্ত?”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ পেলাম।
“তুমি আমাকে ‘চাচা’ না ডেকে ‘বাবা’ ডাকবে। আর যখন তোমার অবস্থা ভালো হবে, তখন আরেকজন বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়াবে। আমার টাকা আমাকে ফেরত দিতে হবে না।”
সেদিন ফোনটা রেখে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।
আমার স্ত্রী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?”
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
শুধু উঠে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম।
কারণ আমার চোখের সামনে হঠাৎ আগের রাতের সিজদাটা ভেসে উঠেছিল।
আমি তো আল্লাহর কাছে বলেছিলাম, “একটা রাস্তা খুলে দিন।”
তিনি আমাকে টাকা আকাশ থেকে পাঠাননি।
তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষের হৃদয় নরম করে দিয়েছিলেন।
আর ওই বৃদ্ধ মানুষটির কথা আমার বহু বছর আগের একটা সামান্য কাজের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন, যেটাকে আমি সেদিন কোনো আমল বলেই মনে করিনি।
পরদিন বাড়িওয়ালাকে আমি ফোন করে বললাম, “আমি বাসা ছাড়ছি না।”
তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “টাকা কোথায় পেলেন?” আমি হেসে বলেছিলাম, “আমি পাইনি। আল্লাহ ব্যবস্থা করেছেন।”
সেদিন রাতে মেয়েটা আবার এসে আমার পাশে বসেছিল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “মা, নতুন জামা কিনবে?” ও আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “আল্লাহ দিলে অবশ্যই হবে।”
আমি ওর মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
তারপর মনে হলো, আমরা বড়রা আসলে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে ভুলে যাই।
আমরা দোয়া করি, কিন্তু তার সঙ্গে নিজের হিসাবও চালাই। বলি, “এভাবে হলে হবে, ওভাবে হলে হবে।” অথচ আল্লাহ কখনো আমাদের হিসাবের মধ্যে কাজ করেন না।
তিনি এমন একজন মানুষকে পাঠাতে পারেন, যার সঙ্গে আপনার জীবনে একদিন মাত্র পাঁচ মিনিট দেখা হয়েছিল।
তিনি এমন একটা দোয়ার উত্তর দিতে পারেন, যেটা আপনি ভেবেছিলেন হয়তো আসমানে পৌঁছায়নি।
কখনো কখনো রহমত আসতে এত দেরি হয় যে আমরা ধরে নিই, আমাদের কথা শোনা হয়নি।
অথচ সত্যিটা হলো, আল্লাহ দেরি করেন না; তিনি শুধু নিজের সময় অনুযায়ী দরজা খুলে দেন।
আমি দেখেছি, সাহায্য কখনো কখনো দরজা ঠেলে আসে না। নিঃশব্দে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
তুমি শুধু হতাশ হয়ে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে রেখো না।
তোমার হয়তো মনে হচ্ছে, সব শেষ। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা শেষ। চাকরি শেষ। সম্পর্ক শেষ। ব্যবসা শেষ। অপেক্ষার শেষ প্রান্তে এসে তুমি হয়তো ভাবছ, “আর কোনো পথ নেই।”
আর যিনি কিনা তোমার জন্য রিজিক লিখেছেন, তিনি এখনও তোমার অদেখা দিকটা দেখছেন। হয়তো যে মানুষটা তোমাকে সাহায্য করবে, সে এখনও জানেই না যে আগামী সপ্তাহে তার জীবনে তোমার নামটা কেন আসবে।
কিংবা যে দরজার জন্য তুমি কান্না করছ, সেটা হয়তো খুলবে না। কিন্তু তার বদলে আল্লাহ তোমাকে এমন একটা দরজায় নিয়ে যাবেন, যেটার কথা তুমি কোনোদিন ভাবোইনি।
তাই সিজদায় গিয়ে শুধু বলো, “ইয়া আল্লাহ, আমি রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না। আপনি দেখছেন। আমাকে শুধু আপনার ওপর ভরসা করার শক্তিটুকু দিন।”
কারণ মানুষের চোখে পথ শেষ হয়ে গেলেও, আল্লাহর কাছে পথ শেষ হয় না।
আমরা শুধু জানি না, তিনি কোন দিক থেকে রহমত পাঠাবেন।
আর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটা কী জানো?
যার জন্য যে রহমত লেখা আছে, পৃথিবীর হাজার রাস্তা ঘুরে হলেও সেটা একদিন ঠিক তার দরজায় পৌঁছে যায়।
আলহামদুলিল্লাহ!
----------
আল্লাহর রহমতের এই ঘটনা সবাই শেয়ার করে দিও নিজের টাইমলাইনে।
লেখা সংগ্রহ