আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। পবিত্র জুমাদাল উখরা শরীফ মাসের তিন তারিখ, দিনটি ছিল ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ দিবাগত রাত। আমার সেজো বোন মিলি আপা (ফুয়াদ, ফাহিমের আম্মু) ইন্তিকাল করেন। উনার মৃতদেহ সন্ধ্যা ০৭:০০ বা ০৭:৩০ মিনিটের দিকে আল মুতুমাইন্নাহ মা ও শিশু ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হল। সেই সময় আমাদের মাথায় কিছুই আসছিল না। কিভাবে কি করব, কোথায় উনার গোসল কাফনের ব্যবস্থা করা হবে? তিনি ছিলেন সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার খুব কাছের একজন খাদিমা। কিছুক্ষণের মধ্যে খবর আসলো দরবার শরীফ উনার ভিতরে মিলি আপার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করা হবে। ভাবছিলাম হয়তো পীরবোনেরা মিলে উনাকে গোসল করাবেন। নির্ধারিত সময় আসলো, মুর্দাকে গোসল করানোর জন্য যা যা প্রয়োজন সব প্রস্তুত। লিফটের রুমের পাশে পর্দা দিয়ে গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পীরবোন আমরা সবাই প্রস্তুত। কিন্তু! আমি কাকে দেখছি! তিনি তো আমাদের আম্মাজী! যিনি সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস তিনি স্বয়ং তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন আপাকে গোসল করানোর জন্য। আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো। অপলক দৃষ্টিতে উনার চেহারা মুবারক উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর ভাবছিলাম, এও কি সম্ভব? যাই হোক, উনার মুবারক নির্দেশনায় গোসলের কাজ শুরু হল। সে রাতের সেই ঘটনা আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন আমার মানসপটে চির অম্লান হয়ে থাকবে। কি যত্ন কি মায়া মুহাব্বত দিয়ে তিনি আপার গোসলের ব্যবস্থা করেছেন তা বলার ভাষা আমার জানা নেই। মাঝে মাঝেই তিনি বলছিলেন, "ওর শরীরে কিন্তু এখন অনেক ব্যথা, তোমরা আস্তে আস্তে কর"।
আমি মা হয়েছি তাই জানি সন্তানের প্রতি মায়ের যে কত ভালোবাসা। কিন্তু সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি আমাদেরকে যে মমতা দিয়ে উনার জান্নাতী বাগিচায় সযত্নে রেখেছেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো মা তার সন্তানের জন্য দেখাতে পারবে না। আবারও আসা যাক সেই প্রসঙ্গে- এরই মধ্যে গোসলের ফাঁকে সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি আমাদেরকে অনেক নছীহত মুবারক করলেন এবং মিলি আপার কিছু স্মৃতিও আমাদের মাঝে তুলে ধরলেন। এরমধ্যে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে তা আমার জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে হোক আর যাই হোক সেটা হচ্ছে, তিনি বললেন- মিলি আমার কাছে ১৯৯৪ সালে এসেছিল। ১৯৯৬ সালে ওকে বিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরে সে দু'জনের মা হলো। এরপর মিলি চোখের সামনেই বিধবা হলো। আর আজ সে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে"। এ কথা মুবারক বলার পর উনার চোখ মুবারক দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। যা দেখে আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম তারা আর নিজেদেরকে ঠিক রাখতে পারলাম না। আমরাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। তিনি উনার শ্যাম্পু মুবারক এনেছিলেন মিলি আপাকে গোসল করানোর জন্য। গোসল শেষে তিনি নিজ হাত মুবারকে মিলি আপার মাথায় পবিত্র সাইয়্যিদুল আ'ইয়াদ শরীফ উনার ফিতা পরিয়ে দিয়েছিলেন, যা ছিল উনারই মুবারক নির্দেশে কবরবাসীর জন্য সর্বপ্রথম সাইয়্যিদুল আ'ইয়াদ শরীফ উনার ফিতা মাথায় ধারণ করা। এভাবে সারা রাত্র জেগে মমতাময়ী মা সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম আপার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করেন। উনার চেহারা মুবারকে কোনো ক্লান্তির ছাপ আমি দেখিনি। গোসল শেষে কাফন পরানোর পর সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি আপার সামনে বসে বললেন, "মিলি! অনেক খেদমত তো করেছো, এখন যাও মঞ্জুর (ফুয়াদ, ফাহিমের আব্বু) পাশে গিয়ে ঘুমাও"। এখানে উল্লেক্ষ্য যে, উনার আহাল জনাব মঞ্জু সাহেব বরাবর চৌদ্দ মাস আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। পাঠক! আপনারা কি আপনাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন? নিশ্চয়ই না। আমরাও পারিনি। আসলে সেই রাতের ঘটনা সম্পূর্ণ বর্ণনা করলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে। তারপর আরো বললেন, "এবার তোমরা (খালারা বাদে) সবাই সরে যাও, ফুয়াদ ফাহিমকে ডাকো। ওরা যতক্ষণ পারে ততক্ষণ যেন ওদের আম্মুর পাশে থাকে। দু'চোখ ভরে শেষ দেখাটা দেখে যাক"। কী সীমাহীন মমতা! সত্যিই সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার তুলনা শুধু তিনি নিজেই।
মিলি আপা ইন্তেকালের আগে উনার দুই ছেলেকে একটা অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। মুঈনা আপা আমাকে বললেন, লিমা আপা! আপনি সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার কাছে সেই আরজিটা পেশ করেন। আমি বললাম, সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম! আপা বলে গেছেন উনার কবরের সুওয়াল-জাওয়াবটা যেন আপনি দিয়ে দেন। একথা শুনে সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি ১০-১৫ সেকেন্ড নিশ্চুপ ছিলেন। পরক্ষণেই বললেন, "ওর তো সুওয়াল-জাওয়াব হবে না"। নির্বাক হয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। খালিক, মালিক রব মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সাথে কত গভীর নিসবত মুবারক থাকলে তিনি এমন উত্তর দিতে পারেন। যা ছিল আমার চিন্তা ও কল্পনার বাইরে।
সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার শান মুবারক আমি কি বর্ণনা করবো। উনার শান-মাক্বাম তো ওয়ারাউল ওয়ারা, ওয়ারাউল ওয়ারা, ওয়ারাউল ওয়ারা...। এর উপরে যদি কোনো মাকাম মুবারক থাকে (যা আমার জানার বাহিরে) তার সম্পূর্ণ অধিকারী হচ্ছেন তিনি। শুধু কি তাই? এ তো গেল গোসল ও কাফন প্রসঙ্গে। মমতাময়ী মা সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি উনার রূহানী সন্তানদের (মুরীদান) সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় সব সময় পাশে থাকেন। যাহিরীভাবেই হোক বাতিনী ভাবেই হোক। মিলি আপা ইন্তেকাল করার এক সপ্তাহ আগে যখন উনাকে মুমূর্ষ অবস্থায় আল-মুত্বমাইন্নাহ শরীফ হাসপাতালে আনা হয়। সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি খবর শুনার কিছুক্ষণের মধ্যে শাহযাদীদ্বয় উনাদেরকে নিয়ে হাসপাতালে তাশরীফ মুবারক নেন। উনারা যতক্ষণ ছিলেন (আনুমানিক আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা) এক মুহূর্তের জন্যও বসেননি। একটু পর পর আম্মাজী মিলি, মিলি বলে ডাকছিলেন এবং অঝোর ধারায় চোখের পানি মুবারক প্রবাহিত হচ্ছিল। যা দেখে আমি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। বাইরে এসে অনেক কান্না করছিলাম। আসলে সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনাকে যারা কাছ থেকে দেখেনি তারা বুঝবে না উনার অন্তরে ও বাহিরে কত মমতা, কত মুহাব্বত!
- আহমাদ ইসমাত জাহান লিমা