কোটিপতির ছেঁড়া মোজা এবং দুটি গোপন চিঠি: জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য!
শহরের সবচেয়ে প্রতাপশালী ও কোটিপতি ব্যবসায়ী তার মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তার সম্পদের কোনো অভাব নেই - দেশে-বিদেশে বাড়ি, বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি; সবই আছে। কিন্তু আজ তার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি তার একমাত্র ছেলেকে কাছে ডাকলেন। ছেলের হাতে দুটি মুখ বন্ধ করা খাম (চিঠি) দিয়ে তিনি বললেন,
"বাবা, আমার সময় শেষ। এই দুটি চিঠি রাখো। আমার প্রথম চিঠিটি খুলবে আমার মৃত্যুর ঠিক পরপরই, গোসল করানোর আগে। আর দ্বিতীয় চিঠিটি খুলবে আমাকে কবরে মাটি দেওয়ার পর।"
ছেলে কাঁদতে কাঁদতে চিঠি দুটি পকেটে রাখল। কিছুক্ষণ পরই ব্যবসায়ী মারা গেলেন।
বাবার নির্দেশ অনুযায়ী ছেলে প্রথম চিঠিটি খুলল। চিঠিতে লেখা ছিল:
"আমার আদরের সন্তান, আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা হলো, আমার আলমারিতে রাখা আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং পুরোনো সেই 'ছেঁড়া মোজা' জোড়া যেন আমাকে পরিয়ে কবরে দেওয়া হয়।
তুমি যেভাবেই হোক আমার এই শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করবে।"
ছেলে দ্রুত বাবার আলমারি থেকে সেই পুরোনো ছেঁড়া মোজা জোড়া বের করে আনল। যখন বাবাকে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরানো হচ্ছিল, তখন ছেলে মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলল,
"হুজুর, আমার বাবাকে এই মোজা জোড়া পরিয়ে দিন। এটি আমার বাবার শেষ ইচ্ছা।"
ইমাম সাহেব চমকে উঠে বললেন, "অসম্ভব! ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিকে তিনটি সাদা কাফনের কাপড় ছাড়া আর কোনো কিছুই পরানো যায় না। এই মোজা পরিয়ে কবরে দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।"
ছেলে নাছোড়বান্দা! সে কেঁদে কেঁদে বলল, "হুজুর, আমি আপনাকে লাখ টাকা দেব, আপনি দয়া করে শুধু এই মোজা জোড়া পরিয়ে দিন। আমার বাবার শেষ ইচ্ছা আমি যেকোনো মূল্যে পূরণ করতে চাই।"
ইমাম সাহেব অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন,
"তুমি আমাকে লাখ টাকা কেন, তোমার বাবার পুরো সম্পত্তি লিখে দিলেও আমি এটা করতে পারব না। মৃত্যুর পর আল্লাহর আইনের সামনে কোনো মানুষের শেষ ইচ্ছা বা টাকার কোনো মূল্য নেই! তোমার বাবাকে সম্পূর্ণ খালি হাতেই কবরে যেতে হবে।"
অবশেষে অনেক তর্ক-বিতর্কের পরও ছেলে পারল না। তার বাবার সেই ছেঁড়া মোজা জোড়া বাইরেই পড়ে রইল এবং তাকে শুধু সাদা কাফন পরিয়েই কবরে মাটি দেওয়া হলো।
বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার চরম কষ্ট আর হতাশা নিয়ে ছেলে বাড়ি ফিরল। ড্রয়িংরুমে বসে কাঁদতে কাঁদতে তার হঠাৎ মনে পড়ল বাবার দ্বিতীয় চিঠিটির কথা।
সে পকেট থেকে দ্বিতীয় চিঠিটি বের করে খুলল। চিঠিতে যা লেখা ছিল, তা পড়ে ছেলের চোখের পানি শুকিয়ে গেল এবং পুরো শরীর যেন বরফ হয়ে গেল!
চিঠিতে লেখা ছিল:
"আমার আদরের সন্তান! তুমি নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছ যে, কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েও, শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ হয়েও, আমি আমার সাথে একটা সামান্য 'ছেঁড়া মোজা'ও কবরে নিয়ে যেতে পারলাম না!
আমার শত কোটি টাকা, আমার ক্ষমতা - কোনো কিছুই আজ আল্লাহর আইনের সামনে আমাকে এক জোড়া পুরোনো মোজা পরারও অধিকার দিতে পারল না!
আমাকে সম্পূর্ণ খালি হাতে, রিক্ত অবস্থায় অন্ধকার কবরে ঢুকতে হলো।
বাবা, এই বিশাল সম্পত্তি, ব্যাংক ব্যালেন্স, আর ক্ষমতার অহংকার একদিন এভাবেই পড়ে থাকবে। তাই আমার এই পরিণতি দেখে শিক্ষা নিও।
দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী সম্পদের লোভে পড়ে কখনো মানুষের হক মেরো না, অহংকার কোরো না এবং নিজের আখেরাত নষ্ট কোরো না। কারণ মৃত্যুর দিন এই দুনিয়ার এক সুতো পরিমাণ জিনিসও তুমি সাথে নিতে পারবে না!"
আমরা সারাজীবন "আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার টাকা" বলে পাগল হয়ে থাকি।
একটু জমির জন্য ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করি, একটু টাকার জন্য মানুষের হক মেরে খাই, মিথ্যার আশ্রয় নিই। আমরা ভুলে যাই যে, শেষ যাত্রায় আমাদের পকেটে কোনো টাকা তো দূরের কথা, কাফনের কাপড়ে কোনো পকেটই থাকে না!
যেখানে জীবনের শেষ বেলায় এক জোড়া ছেঁড়া মোজাও সাথে নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই, সেখানে এই দুনিয়ার অহংকার আর লোভ আমাদের কী কাজে আসবে?
সাথে যাবে শুধু আমাদের নেক আমল আর মানুষের সাথে করা ভালো আচরণ।
Salman Farsi
-- ফারসি থেকে অনূদিত
লেখা সংগ্রহ