স্বপ্নে প্রাপ্ত বাক্যটির (فَرَّحَ - فَرَّحْنَا) মূল শব্দ ও ধারণার সমান্তরাল এবং সাদৃশ্যপূর্ণ কিছু কুরআনুল কারীমের আয়াত ও হাদীস শরীফ নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. সমান্তরাল আয়াত (কুরআনুল কারীম)
ক. রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কেন্দ্র করে আনন্দ প্রকাশ:
> «قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ»
> উচ্চারণ: কুল বিফাদলিল্লাহি ওয়া বিরাহমাতিহি ফাবিযালিকা ফালইয়াফ্রাহূ, হুওয়া খাইরুম মিম্মা ইয়াজমা‘ঊন।
>
অর্থ: “বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে; সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তারা যা জমা করে, তার চেয়ে উত্তম।” (সূরা ইউনুস: ৫৮)
> সাদৃশ্য: মুফাসসিরগণের মতে (যেমন: ইমাম সুয়ূতী ও ইবনে আব্বাস রাযি.), এখানে 'রহমত' বলতে স্বয়ং নবীজি ﷺ-কে নির্দেশ করা হয়েছে (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। তাই তাঁর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা কুরআনের নির্দেশিত আমল।
>
খ. আমলের সমপরিমাণ বা শ্রেষ্ঠ প্রতিদানের নিয়ম (শর্ত ও উত্তর):
> «فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ»
>
উচ্চারণ: ফাযকুরূনী আযকুরকুম ওয়াশকুরূ লি ওয়া লা তাকফুরূন।
> অর্থ: “সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (সূরা বাকারা: ১৫২)
>
সাদৃশ্য: স্বপ্নের বাক্যটিতে যেমন বলা হয়েছে ‘যে আমাদের নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করবে, আমরাও তাকে আনন্দিত করব’, ঠিক তেমনি এই আয়াতেও কাজের অনুরূপ প্রতিদানের নীতি প্রকাশ পেয়েছে।
>
২. সমান্তরাল হাদীস শরীফ
ক. মহব্বত ও আনন্দ প্রকাশের অনুরূপ প্রতিদান:
> «المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ»
> উচ্চারণ: আল-মার'উ মা‘আ মান আহাব্বা।
>
অর্থ: “মানুষ (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে, যাকে সে ভালোবাসে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
> সাদৃশ্য: নবীজি ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনন্দের সুবাদে তাঁর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
>
খ. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরূদ ও সম্মান প্রদর্শনের বহুগুণ প্রতিদান:
> «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا»
>
উচ্চারণ: মান সাল্লা ‘আলাইয়্যা ওয়াহিদাতান সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ‘আশরা।
> অর্থ: “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।” (সহীহ মুসলিম)
>
সাদৃশ্য: বান্দা নবীজি ﷺ-এর সম্মানে কোনো আমল করলে, তার বিনিময়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর পক্ষ থেকে বহুগুণ উত্তম প্রতিদান পৌঁছায়।
>
গ. খিদমত ও মেহমানদারির প্রতিদান:
> «مَنْ فَرَّجَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ»
> উচ্চারণ: মান ফাররাজা ‘আন মু'মিনিন কুরবাতাম মিন কুরাবিদ-দুনিয়া, ফাররাজাল্লাহু ‘আনহু কুরবাতাম মিন কুরাবি ইয়াউমিল কিয়ামাহ।
>
অর্থ: “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবী কষ্ট লাঘব/দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার কষ্ট দূর করে তাকে আনন্দিত করবেন।” (সহীহ মুসলিম)
> সাদৃশ্য: এখানেও শব্দমূলের দিক থেকে এবং আমলের বদলে সরাসরি বিপরীত বা সমজাতীয় প্রতিদান দেওয়ার রূপটি প্রকাশ পেয়েছে।
>
স্বপ্নের বাক্যে উল্লেখিত «الْوَلَائِمِ» (ওয়ালীমাহ/ভোজ) শব্দটির সরাসরি সমান্তরাল এবং সাদৃশ্যপূর্ণ কুরআনুল কারীমের আয়াত ও হাদীস শরীফ নিচে দেওয়া হলো:
১. সমান্তরাল আয়াত (কুরআনুল কারীম)
কুরআনে সরাসরি 'ওয়ালীমাহ' শব্দটি না থাকলেও দ্বীনের প্রয়োজনে, আনন্দের প্রকাশে কিংবা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে খাবার খাওয়ানো ও ভোজের আয়োজন (إِطْعَامُ الطَّعَامِ) সম্পর্কিত একাধিক স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে:
নেয়ামতের শুকরিয়া ও ঈমানের আলামত হিসেবে খাবার খাওয়ানো:
> «وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا»
> উচ্চারণ: ওয়া ইউত‘ইমূনাত-ত্বআ-মা ‘আলা হুব্বিヒー মিসকীনাঁও ওয়া ইয়াতীমাঁও ওয়া আসী রা।
>
অর্থ: "তারা আল্লাহর ভালোবাসায় / খাবারের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে।" (সূরা আল-ইনসান: ৮)
>
আল্লাহর সান্নিধ্য ও জান্নাত লাভের উসীলা:
> «أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ»
>
উচ্চারণ: আও ইত‘আমুন ফী ইয়াউমিন যী মাসগাবাহ।
> অর্থ: "অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান করা/খাবারের ব্যবস্থা করা।" (সূরা আল-বালাদ: ১৪)
>
২. সমান্তরাল হাদীস শরীফ (ওয়ালীমাহ ও খাবার আয়োজন)
হাদীস শরীফে সরাসরি 'ওয়ালীমাহ' (ভোজ/মেহমানদারী) এবং 'খাবার খাওয়ানো'-কে ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল বলা হয়েছে:
সুসংবাদ ও আনন্দের প্রকাশে ওয়ালীমাহ্ করার নির্দেশ:
> «أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ»
> উচ্চারণ: আউলিম ওয়া লাউ বিহাত।
>
অর্থ: "তুমি ওয়ালীমাহ (ভোজের আয়োজন) করো, তা যদি একটি ছাগল দিয়েও হয়।" (সহীহ বুখারী: ২০৪৮)
> সাদৃশ্য: এখানে সুসংবাদ, আনন্দ বা নতুন নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে সামর্থ্য অনুযায়ী ভোজ বা খাবারের আয়োজন করার স্পষ্ট সুন্নাহ নির্দেশিত হয়েছে।
>
ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল—খাবার খাওয়ানো:
> «أَيُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ»
> উচ্চারণ: আইয়্যুল ইসলামি খাইর? ক্বালা: তুৎ‘ইমুত ত্বআ-মা ওয়া তাক্বরাউস সালা-মা ‘আলা মান ‘আরাফতা ওয়া মান লাম তা‘রিফ।
>
অর্থ: "(এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল) ইসলামের কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম? নবীজি ﷺ বললেন: তুমি মানুষকে খাবার খাওয়াবে, আর পরিচিত-পরিচিত সবাইকে সালাম দেবে।" (সহীহ বুখারী: ১২, সহীহ মুসলিম: ৩৯)
>
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের মাধ্যমে আনন্দ প্রাপ্তি:
> «أَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الجَنَّةَ بِسَلاَمٍ»
>
উচ্চারণ: আত‘ইমুত ত্বআ-মা, ওয়া সিলুল আরহা-মা, ওয়া সাল্লূ বিল্লাইলি ওয়ান-না-সু নিয়া-মুন, তাদখুলুল জান্নাতা বিসালা-ম।
> * অর্থ: "তোমরা মানুষকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাত আদায় করো; তাহলে তোমরা শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (জামে' আত-তিরমিযী: ২৪৮৫)
>