ইতিহাস:
হিন্দুত্ববাদী ভারতের ষড়যন্ত্রে যেভাবে স্বাধীনতা হারায় মুসলিম অধ্যুষিত হায়দ্রাবাদ
১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ দখলকৃত উপমহাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান ছাড়াও হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর নামে আলাদা স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল। বিশেষ করে হায়দ্রাবাদের ছিল-
নির্বাচিত সরকার
ছিল নিজস্ব আইন আদালত, বিচার ব্যবস্থা
ছিল নিজস্ব মুদ্রা, সেনাবাহিনী
এমনকি নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল।

সমৃদ্ধ এই স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র দখলে মরিয়া হয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারত। তার অংশ হিসেবে হায়দ্রাবাদের ভেতরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের ঢুকিয়ে দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। রামানন্দ তীর্থ নামক জনৈক মুসলিমবিদ্বেষী কংগ্রেস নেতা ধর্মকে অবলম্বন করে দেশে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলেন।

এই সন্ত্রাসীদের দমনে হায়দ্রাবাদ সরকার অভিযান শুরু করলে তিনি ভারতে পালিয়ে গিয়ে সেখানে বসে এ্যাকশন কমিটি তৈরি করলেন। সেই এ্যাকশন কমিটির লোকজন দলে দলে হায়দারাবাদে ঢুকে পড়ে মুসলমানদের হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এবং সীমান্তরক্ষীদের সাথে খন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হলো।

পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছিলো যে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের পুলিশ দিয়ে ঠেকানো সম্ভব ছিল না, কারণ তাদের হাতে ছিল ভারী যুদ্ধাস্ত্র যা ভারত থেকে সরবরাহ করা হচ্ছিল।

তারা একের পর এক গ্রাম দখল করে সেখান থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ করতে লাগলো, খাজনা আদায় করতে লাগলো। এরকম এক নাজুক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকার সেনাবাহিনী তলব করলেন।

কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছেও পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম সংগঠনগুলো আক্রান্ত মুসলিম জনগণকে সংগঠিত করে, আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র ট্রেনিং দিয়ে তাদের প্রতিরোধ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুললেন।

সেসময় হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত কাসিম রিজভী কলেজ ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তুললেন এক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, যাদের নাম রাখা হলো ‘রেজাকার’ অর্থ্যাৎ স্বেচ্ছাসেবক। এরপর দলে মুসলিমরা তাদের ভূমি রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিল। আল্লাহর সাহায্যে সীমান্ত এলাকায় তারা প্রতিরোধ বুহ্য রচনা করে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম হলো।

কিন্তু ভারতীয় দখলদাররা তাদের ষড়যন্ত্র থামায় নি। তারা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নামে খুন, লুট আর কল্পিত অত্যাচারের গল্প তৈরি করে প্রোপাগান্ডা ছড়াতে শুরু করে তারা প্রচার করতে লাগলো, ভারত হায়দ্রাবাদ আক্রমণ করলে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিন্দুদের কচু কাটা করবে।

হিন্দুত্ববাদীদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে সাধারণ হিন্দুরা দলে দলে ভারতে পালিয়ে যেতে লাগল। সেই সুযোগে দখলদার ভারত মিডিয়াতে প্রচার করতে লাগলো যে, হায়দ্রাবাদে হিন্দুদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। এভাবেই অপপ্রচারের মাধ্যমে হায়দারাবাদের মুসলিমদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে তারা ভারতে সেনা অভিযানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে লাগল।

১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় দখলদার বাহিনী হায়দ্রাবাদ অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন পোলো’ নামে পরিচালিত এই অপারেশনে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর পাশাপাশি অংশ নেয় আর্য সমাজ ও অন্যান্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।

টানা চারদিন মরনপণ লড়াইয়ের পর টিকতে না পারে ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হায়দ্রাবাদ মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আল ইদরুস রাজধানী হায়দ্রাবাদের বাইরে গিয়ে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জেএন চৌধুরীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর হায়দ্রাবাদের প্রায় দুই লাখ মুসলিমদের ওপর নেমে আসে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা।

প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই গণহত্যায় শহীদ হন ৪০ হাজারেরও অধিক মুসলিম। গণহত্যার পাশাপাশি মুসলিমদের বাড়িঘর লুটপাট, নারীদের ধর্ষণ ও সম্পদের দখল করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেয় মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু কংগ্রেস নেতারা। এছাড়া তখন শিশুদের শহীদ করা হয়, বিমান দিয়ে বোমা বর্ষণ করে শহর বন্দর গ্রাম গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং মসজিদ, মাদ্রাসা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়।

গণহত্যার পরে হায়দ্রাবাদকে অন্ধ্র, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র এই তিন রাজ্যে বিভক্ত করা হয়। এভাবে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নষ্ট করে হিন্দুত্ববাদী ভারত। আজ তারা বাংলাদেশকেও আরেকটি হায়দ্রাবাদে পরিণত করতে চায়। তাই আমাদের উচিত ভারতীয় আগ্রাসন এবং হিন্দুত্ববাদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানা এবং এর মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।

image