আশির দশকের মিথ্যা আবেগী নস্টালজিয়া কিনছেন ব্যক্তিগত তথ্যের দামে!!

ফেসবুকের প্রায় প্রতিটি স্ক্রলেই এখন দেখা মিলছে পুরোনো দিনের। যেন ফিরেছে আশির দশকের আবহ। দানাদার ফিল্মের টেক্সচার, ঘন ও ফোলানো চুল, চওড়া কলার ও স্পষ্ট ভ্রু। গম্ভীর অথচ আত্মবিশ্বাসী-ভাবুক অভিব্যক্তি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের স্টোরিতে, ব্যক্তিগত প্রোফাইলে ব্যবহারকারীরা তা শেয়ার করছেন। মেতেছেন এই ডিজিটাল ট্রেন্ডে। আপনি হয়তো নস্টালজিক ফিল করলেন। ভাবলেন নিজেরও এমন একটা ছবি বানানো যাক।

কাজটা সহজ। নিজের তোলা যেকোনো ছবি চ্যাটজিপিটিতে দিয়ে একটা প্রম্পট লিখলেই হলো। মিনিটখানেকের মধ্যে আশির দশক হাজির। আপনি খুশি হলেন। শেয়ার করলেন নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে। কিন্তু একবারও কী ভাবলেন আপনার সেই ছবি এআই টুলটি আর কী কী ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে? এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব কী রয়েছে?

মুখ শুধুমাত্র ছবি নয়

আপনার ছবিতে শুধুমাত্র অবয়ব থাকে না, এর সঙ্গে আপনার বায়োমেট্রিক তথ্যের সংযোগ রয়েছে। চলমান এই আশির দশকের ট্রেন্ড নিয়ে তুরস্কের টিজিআরটি নিউজে ফরেনসিক ইনফরমেটিকস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আলি মুরাত কিরিক সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “ছবি আপলোডের মুহূর্তেই ব্যবহারকারী নিজের মুখসহ ব্যক্তিগত ডেটা একটি ডিজিটাল সেবার হাতে তুলে দিচ্ছেন; মুখের রেখা, চোখ, নাক ও চোয়ালের গড়ন — এগুলোই একজন ব্যক্তিকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে।”

ড. কিরিক সতর্ক করেন, একই মানুষের বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন কোণ থেকে তোলা একাধিক ছবি জমা হলে ঝুঁকি বাড়ে, কারণ তখন ওই ব্যক্তির অনেক নিখুঁত একটি ফেসিয়াল প্রোফাইল দাঁড়িয়ে যায়। ট্রেন্ডে আমরা শুধুমাত্র একটা ছবি দিয়েই থামি না। পছন্দ না হলে আরেকটা। সেটা পছন্দ না হলে অপরটা দিয়ে চেষ্টা করি। আর প্রতিটি চেষ্টাই ওই প্রোফাইলে যোগ হচ্ছে। ফলে আপনার আরও নিখুঁত বিবরণ পাচ্ছে টুলটি।

ছবির ভেতরে আর যা যা যাচ্ছে

আপনি যেই ছবি এআই টুলে দিচ্ছেন সেটি কী শুধু ছবিটাই বিশ্লেষণ করে নাকি আরও কিছু করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর আছে সম্পর্কে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডারের এক প্রতিবেদনে। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে ঝুঁকিটা ছবিতে তৈরি হয় না, বরং মূল ছবির ভেতরে থাকা বাকি সব তথ্যে থাকে আসল বিপদ। ছবির পেছনের দৃশ্য, কর্মস্থলের ইঙ্গিত, ইউনিফর্ম, নথি, শিশুদের মুখ, ঠিকানা, লোকেশনের সূত্র ও মেটাডেটা মূল ঝুঁকি তৈরি করে।

আর যদি পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবি আশির দশকের আবহে বানাতে যান তখন বিষয়টি আলাদা একটি মাত্রা যোগ করে। কারণ ছবিতে আপনি একা নন অন্য কেউ থাকলে তার সম্মতি না নিয়েই আপনি সেটা এআইয়ে দিচ্ছেন। ফলে আপনার একা সম্মতিতে বাকিদের তথ্যও চলে যাচ্ছে এআই টুলে।

ওপেনএআই ছবি নিয়ে কী করে?

ওপেনএআইয়ের প্রাইভেসি পলিসি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীর কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারে। আপলোড করা ফাইল ও ছবিসহ অন্যান্য তথ্য সেবা উন্নয়নের জন্য, অর্থাৎ চ্যাটজিপিটির পেছনের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করতে পারে। তবে ব্যবহারকারী চাইলে সেটা বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু কনজিউমার অ্যাকাউন্টে এটি ডিফল্টে চালু থাকে, বন্ধ করতে যেতে হয় সেটিংস এরপর ডেটা কনট্রোলসে গিয়ে। তবে ব্যবসায়িক স্তরে (এন্টারপ্রাইজ, টিম, এপিআই) নিয়মটি উল্টো। সেখানে ডিফল্টেই কোনো তথ্য প্রশিক্ষণে ব্যবহার হয় না।

অর্থাৎ যিনি বিনা খরচে ব্যবহার করছেন, তার ছবিই ডিফল্টে ব্যবহারযোগ্য। ডিলিট প্রসঙ্গেও আছে সীমাবদ্ধতা। নীতিমালা বলছে, তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করলে ৩০ দিনের মধ্যে তা সরানো হয়। যদিও নিরাপত্তা, প্রতারণা প্রতিরোধ বা আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে দীর্ঘ সময় রাখার সুযোগও আছে। তবে ওপেনএআইয়ের ব্যবহারনীতিতে সম্মতি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটাবেজ তৈরি এবং সম্মতি ছাড়া কারও চেহারা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট বানানো স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে মজিলা ফাউন্ডেশনের “প্রাইভেসি নট ইনক্লুডেড” দল বহুদিন ধরেই এই পলিসির সমস্যার কথা বলে আসছে। তারা বলছে, ব্যবহারকারীরা চ্যাটবটে যে ছবি বা লেখা দিচ্ছেন, সেটা কীভাবে কাজে লাগছে, কোথায় জমা থাকছে, কার হাতে যাচ্ছে, এসব খুঁজে বের করা সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য প্রায় অসম্ভব। আর এই ধোঁয়াশা অনেক সময় ইচ্ছাকৃত।

আশঙ্কাটা কি অমূলক?

ছবিগুলো যেখানে জমা হয়, সেখান থেকেও ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাইবার-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করা সংবাদমাধ্যম সাইবারনিউজের একটি প্রতিবেদনে এমন একটি ঘটনা পাওয়া যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁরা গুগল প্লে স্টোরের একটি জনপ্রিয় এআই ছবি ও ভিডিও বানানোের অ্যাপ পরীক্ষা করেন। অ্যাপটির ডাউনলোড ৫ লাখের বেশি, রেটিংও ভালো। কিন্তু তাঁরা দেখতে পান, অ্যাপটির ক্লাউড স্টোরেজ খোলা পড়ে আছে। কোনো পাসওয়ার্ড নেই, কোনো যাচাই নেই। ঠিকানাটা জানা থাকলে যে কেউ ঢুকে সব দেখতে পারত। ভেতরে ছিল ব্যবহারকারীদের আপলোড করা ১৫ লাখেরও বেশি ছবি। সঙ্গে পৌনে চার লাখ ভিডিও। সব মিলিয়ে প্রায় ৮২ লাখ ফাইল; যা ১২ টেরাবাইটেরও বেশি। কিন্তু মানুষগুলোর কেউই জানতেন না। তাঁরা হয়তো শুধু একটা মজার ছবি বানাতে চেয়েছিলেন।

ঝুঁকি সম্পর্কে আরেকটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় ভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে “ন্যানো বানানা শাড়ি” ট্রেন্ডে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ঝলক ভবানী সবুজ কামিজ পরা একটি ছবি দিয়েছিলেন গুগল জেমিনিতে। ফেরত আসা রেট্রো পোর্ট্রেটে তাঁর বাঁ হাতে একটি তিল ছিল যা আপলোড করা ছবিতে ছিল না। যদিও বাস্তবে তাঁর হাতে তিল ছিল, কিন্তু আপলোড করা ছবিতে না থাকার পরও এআই ছবিতে দেখতে পাওয়া পর তিনি অনুসারীদের সতর্ক করে পোস্ট দেন। যদিও সেটি কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবুও প্রশ্নটা থেকে যায়, সিস্টেম আপনাকে নিয়ে কী অনুমান করছে? তা যাচাই করার উপায় আপনার নেই।

পরের ধাপের ঝুঁকিটা আরও বেশি। সিএনবিসি ও টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্টের অনুসন্ধানে মিনেসোটার একটি ঘটনায় ৮০ জনের বেশি নারীর সামাজিক মাধ্যমে থাকা প্রকাশ্য ছবি ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই যৌন ডিপফেক তৈরির প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশেও কিছু ঘটনা থানা পর্যন্ত গেছে। চলতি বছরের মে মাসে কুমিল্লার চান্দিনায় এক নারী উদ্যোক্তার এআই দিয়ে বানানো অশ্লীল ছবি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মামলার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আইন কী বলছে?

গত নভেম্বরে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের তথ্যের মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা ব্যবহারের আগে সুস্পষ্ট সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তবে ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, “ইমেজ-বেইজড অ্যাবিউজ” নামে আলাদা কোনো অপরাধ এখনো কোনো আইনে নেই। এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেকের কথাও স্পষ্ট নেই। ফলে মামলা চলে মানহানি বা অশ্লীলতার সাধারণ ধারায়।

তাহলে কী করার আছে? খুব সহজ কয়েকটা অভ্যাস। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। এআই টুলের সঙ্গে আসল ছবি শেয়ার, প্রম্পট যতটা সম্ভব সাধারণ রাখুন। আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে টুলটিকে ব্যক্তিগত, বিশ্বস্ত সঙ্গী ভাববেন না; বরং একে একটা পাবলিক জায়গা হিসেবেই ধরে নিন। যেখানে যা রাখছেন তা অন্য কেউ দেখতে পারে এমনটা ভাবুন। বিশেষ করে নিজের ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি অন্যের হাতে দিতে স্বাচ্ছন্দ্য না লাগলে পুরোপুরি সরে আসা।

ফরেনসিক ইনফরমেটিকস বিশেষজ্ঞ কিরিকের ভাষ্যে, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দেখাতে পারে আশির দশকে আমাদের কেমন দেখাত। কিন্তু জরুরি প্রশ্নটা হলো, আজ যে মুখটা আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দিচ্ছি, কাল সেটি কোথায় ব্যবহার হতে পারে।”
- লেখা সংগৃহীত
#80s #80svibes #80strend #digitalsafety #dharafactschool