10 گھنٹے

আল্লামা ইউসুফ আন-নাবাহানী (রহ.)-এর 'জাওয়াহিরুল বিহার' কিতাবের সূত্র ধরে এবং ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.)-এর ফতোয়ার আলোকে সমুদ্রপথে মিলাদ শরীফের বরকতের যে বাস্তব সত্য ওয়াক্বিয়া ও ঐতিহ্যগত ঘটনা পাওয়া যায়, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
লোহিত সাগরের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ওয়াক্বিয়া ও নাবিকদের অভিজ্ঞতা
ইয়েমেনের হাদরামাউত, হেজাজ এবং ভারত মহাসাগরের মুসলিম নাবিক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্রে বিপদের সময় মিলাদ ও দুরুদ শরিফ পাঠের এক চমৎকার ঐতিহ্যবাহী আমল প্রচলিত ছিল।
ঝড়ের কবলে বাণিজ্যিক জাহাজ: একবার ইয়েমেন ও এডেন বন্দর থেকে মক্কার জেদ্দা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগরের মাঝপথে প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে। বাতাসের তীব্রতায় জাহাজের মাস্তুল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং জাহাজের ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করে।
বাঁচার আশা ত্যাগ ও মিলাদের উসিলা: আরোহী ও নাবিকেরা যখন বাঁচার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তখন জাহাজে থাকা এক সুফি আলেম সবাইকে একত্রিত করে বলেন, মহান আল্লাহর দরবারে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের কাছে তাঁর হাবীব (সা.)-এর জন্মের খুশির আলোচনা ও দুরুদের চেয়ে বড় কোনো উসিলা নেই।
মিলাদ ও দুরুদ পাঠের অলৌকিক প্রভাব: তাঁর কথামতো জাহাজের সমস্ত যাত্রী ও ক্রু ক্রন্দনরত অবস্থায় অত্যন্ত ভক্তিভরে নবীজি (সা.)-এর আগমন বা মিলাদের গৌরবময় আলোচনা এবং সালাতু সালাম (দুরুদ) পাঠ করতে শুরু করেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, মিলাদ শরীফের মজলিস শেষ হতে না হতেই অলৌকিকভাবে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ শান্ত হয়ে যায়, ঝড় সম্পূর্ণ থেমে যায় এবং জাহাজটি কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর ফতোয়া ও বাস্তব সত্যের যোগসূত্র
এই ধরনের অসংখ্য পরীক্ষিত ও বাস্তব ঘটনার আলোকেই পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-ওয়াসায়িল ফি শারহিশ শামায়িল'-এ ফতোয়া প্রদান করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন:
"যে কোনো মুসলমান যদি সফরে বা তার ঘরে নবীজি (সা.)-এর মিলাদ শরীফ পাঠের আয়োজন করে, তবে মহান আল্লাহ তাকে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি 'الغرق' অর্থাৎ পানিতে ডুবে যাওয়া বা জলডুবি এবং চোরের উপদ্রব থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন।"
'মাওলিদে বারজানজি' ও 'জাওয়াহিরুল বিহার'-এর নামকরণ
নাবিকদের পরম বন্ধু 'বারজানজি': এই সামুদ্রিক অলৌকিক নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে আরব ও সুদূর ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার নাবিকেরা সমুদ্রযাত্রার সময় সবসময় ইমাম জাফর আল-বারজানজি রচিত মিলাদগ্রন্থ 'মাওলিদে বারজানজি' (যার মূল নাম 'عقد الجوهر في مولد النبي الأزهر' বা 'উজ্জ্বল নবীজির জন্ম বৃত্তান্তে মুক্তার মালা' সাথে রাখতেন এবং ঝড়-তুফানের সময় জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে এটি সমস্বরে পাঠ করতেন।
কিতাবের নামকরণের রহস্য: আল্লামা ইউসুফ আন-নাবাহানী (রহ.) মিলাদ, দুরুদ ও সালাতের এই সমুদ্রসম অলৌকিক বরকত ও কিতাবসমূহের উদ্ধৃতি সংকলন করে তাঁর বিখ্যাত কিতাবের নাম রেখেছেন "جواهر البحار" (জাওয়াহিরুল বিহার) [১], যার শাব্দিক অর্থ হলো "সমুদ্রের রত্নসমূহ"। এর মাধ্যমে তিনি মূলত নবীজির শানে মিলাদ ও দুরুদের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অর্জিত অলৌকিক রহমত ও রত্নরাজির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।