বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট। এখানে গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে আলোচনার কোনো অভাব নেই। কেউ যদি ভারতের 'র' এর সাথে বৈঠক করে, তবে তাকে নিয়ে পত্রিকায় বিশাল হেডলাইন হয়। কেউ যদি পাকিস্তানের 'আইএসআই'-এর সাথে যোগাযোগ রাখে, তবে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। আমেরিকার 'সিআইএ'-এর তৎপরতা নিয়ে তো পাড়ার চায়ের দোকানেও নিয়মিত আড্ডা চলে।

কিন্তু একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার নাম এই দেশের রাজনীতিতে যেন একটি অলিখিত ট্যাবু বা নিষিদ্ধ শব্দ। সেটি হলো ইসরায়েলের 'মোসাদ'। যে দেশটির সাথে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, যে দেশের পাসপোর্টে পরিষ্কার লেখা থাকে "দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সেপ্ট ইসরায়েল"...সেই দেশের গোয়েন্দাদের সাথে যখন আমাদের দেশের একজন প্রথম সারির তরুণ রাজনীতিবিদ যোগাযোগ রাখেন, তখন কেন সবাই চুপ থাকে?

এই নীরবতা কোনো সাধারণ অজ্ঞতা নয়; এই নীরবতা হলো এক গভীর ভয়ের বহিঃপ্রকাশ। সবাই জানে, ইসরায়েলের সাথে কানেক্টেড কোনো কিছুর একটা চুল ছেঁড়ার ক্ষমতা বর্তমান ওয়ার্ল্ড অর্ডারে কারও নেই। আর ঠিক এই ভয়ংকর ইমিউনিটি বা দায়মুক্তি নিয়েই রাজনীতির মাঠে খেলছেন তরুণ নেতা নুরুল হক নুর।

বিষয়টি কোনো গুঞ্জন বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। স্বয়ং নুরুল হক নুর নিজে মিডিয়ার সামনে স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেদের সাথে তার যোগাযোগ হয়েছে। একজন রাজনীতিক যখন এতটা প্রকাশ্যে একটি শত্রুভাবাপন্ন দেশের গোয়েন্দাদের সাথে যোগাযোগের কথা স্বীকার করেন, তখন বুঝতে হবে তার পেছনের খুঁটি কতটা শক্ত!

তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোও কোনো মামুলি বিষয় নয়। অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলের কাছ থেকে কয়েক শত কোটি টাকার ফান্ডিং বা অর্থায়ন পেয়েছেন তিনি। এই অভিযোগগুলো কেবল দেশীয় রাজনৈতিক বিরোধীদের নয়। খোদ ফিলিস্তিনের অ্যাম্বাসেডর বা রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন যে, বিভিন্ন দেশে নুর নিয়মিত ইসরায়েলিদের সাথে বহু গোপন মিটিং করেছেন। এ সংক্রান্ত খবর গণমাধ্যমে বহুবার প্রকাশিত হয়েছে, ছবি ভাইরাল হয়েছে।

যেকোনো স্বাধীন দেশে এমন একটি অভিযোগ উঠলে, খোদ রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের পর সেই রাজনীতিককে অবিলম্বে ইন্টারোগেশন বা জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নেওয়া হতো। এটি কোনো সাধারণ দুর্নীতি বা রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি নয়; এটি সরাসরি 'জাতীয় নিরাপত্তা'র ইস্যু। একটি শত্রু রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে দেশের একজন নেতার যোগাযোগ কেন? কী তাদের উদ্দেশ্য? কিন্তু না, তাকে কোনো ইন্টারোগেশন করা হয়নি, আর বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার যে চিত্র, তাতে হয়তো কোনোদিন হবেও না।

সবচেয়ে গা গুলিয়ে ওঠা দৃশ্যটি দেখা যায় আমাদের দেশের কথিত ইসলামি দলগুলোর আচরণে। আমরা হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের জন্য চোখের জল ফেলি। জুমার খুতবায় ইসরায়েলের মুণ্ডুপাত করি, রাস্তায় নেমে ইসরায়েলের পতাকা পোড়াই, স্লোগান দিই।

কিন্তু কী এক অদ্ভুত সেলুকাস এই দেশ! যখনই সুযোগ আসে, এই একই ইসরায়েল-বিরোধী ইসলামি দলগুলো সেই নুরকেই তাদের সভা-সেমিনারে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চে তুলে দেয়! যে নেতাকে বিশ্লেষকদের অনেকেই মোসাদের চিহ্নিত এজেন্ট হিসেবে মার্ক করেন, যার ইসরায়েলি কানেকশন একটি ওপেন সিক্রেট, তাকেই আমাদের ইসলামি দলগুলো তাদের পোডিয়ামে বক্তব্য দেওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকে।

এটি আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং ভণ্ডামির সবচেয়ে নগ্ন রূপ।

সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে নুরের দুর্নীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অন্ধকার দিক নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে, মানুষ সমালোচনা করছে।

কিন্তু এসব দুর্নীতি বা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির চেয়েও কোটি গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার সেই ইসরায়েলি কানেকশন। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, ইলিয়াস হোসাইনের ওই ভিডিওর কারণে নুরের একটা চুলও ছেঁড়া যাবে না! কেন? কারণ তার পেছনে যে অদৃশ্য শক্তি বা শিল্ড কাজ করছে, তা আমাদের দেশের সাধারণ আইন বা রাজনৈতিক বিরোধিতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

ইসরায়েলের সন্তান এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই অপ্রতিরোধ্য। তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং লবিং এতই শক্তিশালী যে, তারা তাদের 'এজেন্ট' বা 'অ্যাসেট'-কে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করে।

নুরের পেছনে এমন একটা শক্তি আছে, যেটা তাকে ক্ষমতার শীর্ষে বা রাজনীতির মূল স্রোতে সবসময় রাখবেই, রাখতেই হবে। যদি বিএনপি তাকে না নেয়, তবে তাকে আওয়ামী লীগ লুফে নেবে। আর যদি এরা কেউ না নেয়, তবে জামায়াত বা হেফাজতের মতো দলগুলোও তাকে কাছে টানতে সর্বদা ইচ্ছুক। কারণ, ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতির চেয়ে 'ব্যাকআপ' বেশি জরুরি, আর নুরের ব্যাকআপ হলো এমন এক শক্তি, যার দিকে আঙুল তোলার সাহস এই দেশে খুব কম মানুষেরই আছে
লেখা সংগ্রহ