ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৭)
, ২৬ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১১ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১০ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) ইলমে তাছাউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৭)
৩১। শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার শান-মান, মর্যাদা-মর্তবার খেলাফ কোন কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা, আচার-আচরণ কিংবা অন্য কোন বিরুপ মন্তব্য করবে না।



কেননা তা ফায়েজ-তাওয়াজ্জুহ হাছিলের ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ঈমান ও আমল বিনষ্টের কারণও বটে। যেমনিভাবে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের বেলায় ঈমান ধ্বংসের কারণ তথা কুফরী এবং মুনাফিকীর অন্তর্ভুক্ত।

সীরতে ইবনে হিশামসহ অন্যান্য সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে যে, ৯ম হিজরীতে তাবুকের জিহাদ সংঘটিত হয়। এ জিহাদে যাওয়ার পথে এক স্থানে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উটনী হারিয়ে যায়। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা উটনীটি খুঁজতে বের হলেন। এ সময় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উপস্থিত ছিলেন।

যিনি আকাবার বাইয়াত ও বদর জিহাদে অংশগ্রহণকারীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু আমরের বিশিষ্ট ও প্রবীণ ব্যক্তি। আর উনার দলের ভিতরেই যায়িদ ইবনে লুছাইত নামক বনু কাইনুকা গোত্রের জনৈক মুনাফিক ছিলো। যে ছিলো ছাহাবীর ছদ্মাবরণে মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর সমমনা। অথচ সাইয়্যিদুনা হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি তা জানতেন না।

হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে উপস্থিত ছিলেন। মুনাফিক যায়িদ ইবনে লুছাইত সেখানে ছিলো না। সে ছিলো সাইয়্যিদুনা হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সম্প্রদায়ের নিকট। মুনাফিক যায়িদ ইবনে লুছাইত বললো, “আচ্ছা, মুহম্মদ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো দাবী করেন যে, তিনি মহাসম্মানিত নবী ও রসূল। তিনি তোমাদেরকে আকাশের খবর জানান। কিন্তু তিনি এতটুকু জানেন না যে, উনার উটনীটি কোথায়?” নাঊযুবিল্লাহ!

ঠিক সেই মুহূর্তে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার উপস্থিতিতেই বললেন, “একজন লোক বলতেছে যে, আমি নিজেকে সম্মানিত নবী ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দাবি করে থাকি এবং তোমাদেরকে আকাশের খবরাদি জানিয়ে থাকি, কিন্তু আমি কেন আমার উটনীটি এখন কোথায় তা জানি না?”

মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে যা জানিয়েছেন আমি তাই জানি। মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে উটনীর সন্ধান দিয়েছেন। এই উপত্যকার ভিতরেই তা অমুক জায়গায় রয়েছে। একটি গাছের সাথে তার লাগাম আটকে গেছে। আপনারা গিয়ে উটনীটিকে নিয়ে আসেন।” হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা গিয়ে উটটিকে নিয়ে আসলেন।

অতঃপর সাইয়্যিদুনা হযরত উমারাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এইমাত্র আমাদের কাছে এক বিস্ময়কর খবর জানালেন। আমাদের বাহিনীর মধ্যে কে নাকি এরূপ কথা বলেছে যা মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে জানিয়ে দিয়েছেন।”

তখন সাইয়্যিদুনা হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সম্প্রদায়ের একজন- যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট যাননি। তিনি বললেন, “মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! যায়িদই এ কথা বলেছে।”

তখন সাইয়্যিদুনা হযরত উমারাহ ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যায়িদের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করে বললেন,“ হে মহান আল্লাহ পাক উনার বান্দা, আমার কাছে এসো। আমার কাফেলায় একটি সাপ লুকিয়ে আছে আমি তা জানতেও পারিনি। হে মহান আল্লাহ পাক উনার দুশমন, তুমি আমাদের কাফেলা থেকে বের হয়ে যাও। আমাদের সাথে থাকতে পারবে না।” (সীরাতে ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ২/৫২৩; তারীখে তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক, ২/১৮৩-১৮৪; বাইহাকী শরীফ, দালায়িলুন নুবুওয়াহ, ৫/২৩১-২৩২)

উল্লেখ্য যে, মুনাফিক সরদার উবাই ইবনে সূলুল এবং যায়িদ ইবনে লুছাইতের মতো একদল লোক সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছোহবত মুবারকে বা সান্নিধ্যে ছিলো, যারা ছূরতান অনেক ভালো কাজ করেছে, বিভিন্ন যুদ্ধ-জিহাদে শরীক ছিলো তবুও হিদায়েতের আলো পায়নি। কারণ তাদের অন্তর ছিলো কুফরী ও নেফাকীতে ভরপুর। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

অর্থ: “কখনও এরূপ নহে, বরং তাদের অন্তরসমূহে তাদের (গর্হিত) কার্যকলাপের দরুণ মরিচা ধরেছে।” (সূরা আল মুতাফ্ফিফীন/১৪)

তাদের সেই গর্হিত কার্যকলাপে লালিত কুফরী, শিরকী ও মুনাফিকীর কারণে চিরতরের জন্য তাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক মোহর মেরে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহের উপর ও তাদের কর্ণসমূহের উপর এবং তাদের চোখের উপর পর্দা রয়েছে। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (পবিত্র সূরা বাকারা/৭) (অসমাপ্ত)



-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।