✴️✴️✴️ফায়েজ-তাওয়াজ্জুহ লাভের প্রকারভেদ ও সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
=========================≠========
‘ফাইদ্ব’ ও ‘তাওয়াজ্জুহ’ শব্দ মুবারকদ্বয় আরবী। ‘ফাইদ্ব’ শব্দটি আরবী ‘ফাইদ্বহ’ শব্দ মুবারক থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ- কল্যাণ, ভালো ফলাফল, সুফল, নিয়ামত, বরকত, মর্যাদা ইত্যাদি। আর ‘তাওয়াজ্জুহ’ শব্দটি বাবে তাফা‘উল থেকে ইসমে মাছদার বা ক্রিয়ামূল। যার আভিধানিক অর্থ- দৃষ্টি নিক্ষেপ, নেক নজর, নেক করম, সন্তুষ্টির দৃষ্টি, রুজু হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং ‘ফাইদ্ব-তাওয়াজ্জুহ’ উনাদের সামগ্রিক অর্থ হলো নিয়ামত দানের জন্য নেক দৃষ্টি, বরকতময় নেক নজর। (সমূহ অভিধান গ্রন্থ)

সম্মানিত তরীক্বত উনার পরিভাষায়, ফয়েজ হচ্ছে এক প্রকার নূর বা আলো বিশেষ। যা সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার তরফ থেকে মুরীদের প্রতি নিক্ষেপ করা হয়। যা মুরীদের হিদায়েত, ইছলাহ অর্জন এবং হক্বের উপর ইস্তিক্বামত থাকার কারণ হয়।


সমস্ত ওলীআল্লাহ উনারা উনাদের মুরীদ, মু’তাকিদদেরকে ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ দান করেন। আর সমস্ত সালিক বা মুরীদ উনাদের সম্মানিত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট থেকে ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করে পূর্ণতায় পৌঁছে থাকেন এবং খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের হাক্বীক্বী রেযামন্দী-সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করে থাকেন।

ফয়েজের প্রকারভেদ: ফয়েজ অনেক প্রকার। তবে তাছাউফের কিতাবসমূহে সাধারনভাবে ৪ প্রকার উল্লেখ করা হয়, যথা-

১. ফয়েজে ইনয়িকাসী। ২. ফয়েজে ইল্ক্বায়ী। ৩. ফয়েজে ইছলাহী। ৪. ফয়েজে ইত্তেহাদী।

প্রথম “ফয়েজে ইনয়িকাসী।” যেমন, কোন ব্যক্তি আতর শরীরে মেখে কোন মজলিসে উপস্থিত হলে তার সুঘ্রাণে মজলিসের সমস্ত লোক মোহিত হয়। এটা সাধারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের ফয়েজের উদাহরণ। কেননা, সেই ব্যক্তি মজলিস হতে প্রস্থান করলে উক্ত সৌরভ বা সুঘ্রাণ স্থায়ী থাকেনা। অনুরূপ কোন ওলীউল্লাহ কোনস্থানে উপস্থিত হলে উনার রূহানী ফয়েজ বা জ্যোতির প্রভাবে সাধারণ লোক বিমোহিত হতে থাকে। আর এর কারণেই উক্ত এলাকার মৃত ব্যক্তিরা পর্যন্ত ফায়দা হাছিল করে থাকে। সুবহানাল্লাহ!

দ্বিতীয় “ফয়েজে ইল্ক্বায়ী।” যেমন, কোন ব্যক্তি তার প্রদীপকে অন্য ব্যক্তির প্রদীপের আগুন দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করে নেয়। এই প্রকার ফয়েজ প্রথম প্রকার ফয়েজ অপেক্ষা অধিক প্রভাবযুক্ত হয়ে থাকে। কেননা, কিছুকাল এর প্রভাব স্থায়ী থাকে কিন্তু প্রবল বাতাস প্রবাহিত হলে এটা নির্বাপিত হয়ে যায়। এতে নফ্স ও লতিফাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পরিশুদ্ধ হয়না।


তৃতীয় “ফয়েজে ইছলাহী।” যেমন, কোন ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। উক্ত ড্রেন বা নালাতে যদি কোন ময়লা, তৃণ, ঘাস বা দুব্বা ইত্যাদি পড়ে তৎক্ষনাৎ তা দূরীভূত হয়ে উক্ত ড্রেন বা নালা পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে যদি কোন বড় আকারের পাথর বা বড় মাটির টুকরা উক্ত ড্রেন বা নালায় পড়ে তবে তা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রকার ফয়েজের প্রভাব অনেককাল স্থায়ী হয়ে থাকে।

চতুর্থ “ফয়েজে ইত্তেহাদী।” কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা নিজ আত্মাকে (রূহকে) দৃঢ়তার সাথে মুরীদের আত্মার সাথে সংযোগ করেন। এতে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার আত্মার প্রভাব মুরীদের আত্মায় প্রবেশ করে, এটা সর্বাপেক্ষা প্রবল ফয়েজ।

ফয়েজে ইত্তেহাদী ব্যতিত মূল নিয়ামত হাছিল করা কখনোই সম্ভব নয়।

আল্লামা মাওলানা মুহম্মদ রুহুল আমীন বশিরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘মুর্শিদে মুকাম্মিল ব্যক্তিগণ তাওয়াজ্জুহ দানে নিজের আত্মাকে সজোরে মুরীদের আত্মার সাথে সংযোগ করত: স্বীয় আত্মিক নূর বা জ্যোতি তার আত্মার উপর নিক্ষেপ করেন।’ তিনি আরো বলেন, ফয়েজে ইত্তেহাদীর তাছীর বা প্রভাব অন্যান্য ফয়েজ অপেক্ষা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রবল। যেহেতু তাতে ‘মুর্শিদে মুকাম্মিল’ উনার সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ক্রিয়া বা ফয়েজ মুরীদের হৃদয়ে সঞ্চালিত হয়ে থাকে।’ (তাফসীরে আব্দুল হাই ছিদ্দিক্বী)

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وَتَزَوَّدُوْا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوٰى

অর্থ: ‘তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করো। নিশ্চয়ই তাক্বওয়া বা পরহেযগারীতা সর্বোত্তম পাথেয়।’ (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ-১৯৭)

হযরত শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ ব্যতীত হাক্বীক্বী তাক্বওয়া হাছিল করা সম্ভব নয়। হক্ব মত ও হক্ব পথের উপর ইস্তিকামত (অটল) থাকাও সম্ভব নয়। কাজেই সেই ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ লাভের জন্য সবসময় তৎপর থাকা আবশ্যক।

শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার প্রতি গভীর মুহব্বত, তা’যীম-তাকরীম বিশুদ্ধ নিয়ত এবং সুধারণা, চেষ্টা, সাধনা যদি যথার্থ হয় তাহলে পৃথিবীর যে কোন স্থানে অবস্থান করলেও ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ লাভ করা যায়। কিন্তু ছোহবত মুবারকের বরকত ও ফায়দা ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ব্যতীত লাভ করা সম্ভব নয়। সম্মানিত শায়েখ উনার দু’চোখের ভ্রু’দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থান থেকে যে ফয়েজের স্রোতধারা বিচ্ছুরিত হয় তাও ছোহবত মুবারক ব্যতিত হাছিল করা যায় না।

শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনিই ফয়েজ হাছিলের উৎস। উনার কথা মুবারক, আচার-আচরণ মুবারক এমনকি উনার নাম মুবারক থেকেও সেই নূর মুবারক প্রবাহিত হয়। সালিক বা মুরীদ আদব ও শ্রদ্ধার সাথে উনার ছানা-ছিফত করলে ও নছীহত মুবারক শুনলে এবং তাছাওউর (ছূরত মুবারকের ধ্যান) করলে ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ হাছিল হয়।

তাছাওউফের কিতাবে উল্লেখ আছে, দুচোখের ভ্রু’দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থান থেকে বিশেষ এবং অধিক পরিমাণে ফয়েজ বিচ্ছুরিত হয়। কাজেই সালিক বা মুরীদের সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা উচিত।