আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর বিধর্মীপ্রীতিতে মত্ত শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত
বর্তমান বিশ্বে মুসলমানরা এক চরম দুরবস্থায় দিনাতিপাত করছে। কাফির-মুশরিকরা তো রয়েছেই, সাথে সাথে কাফির-মুশরিকদের সন্তুষ্টি অর্জনে মুসলিম দেশগুলোর শাসকরাও নিজ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার চালাচ্ছে। কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ সাজার জন্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব করে, উগ্র হিন্দু-উপজাতি সন্ত্রাসীদের প্রাধান্য বিস্তারে যাবতীয় সহায়তা করছে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা।
বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ ইমেজ ধরে রাখতে গিয়ে কাফিরদের গোলাম হয়। সংখ্যালঘু বিধর্মীদের অন্যায় আবদার মেটাতে গিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে এসব নামধারী মুসলিম শাসকরা উপেক্ষা করে। এরা বুঝতে পারে না যে, মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় কাফিরদের প্রতি কঠোর হয়েও সহানুভূতিশীল ইমেজ রক্ষা করা সম্ভব। এই নজির স্থাপন করেছিলেন দ্বিতীয় খলীফা, খলীফাতুল মুসলিমীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে লক্বব মুবারক দেয়া হয়েছে ‘আশিদ্দাউ আলাল কুফফার’ অর্থাৎ যিনি কাফিরদের প্রতি কঠোর। তিনি কাফিরদের প্রতি কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তারপরও ইতিহাসের বিচারে উনাকে কেউ নিষ্ঠুর বলে দাবি করতে পারবে না। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার খিলাফত মুবারক চলাকালে তিনি আরবের কোথাও কোনো ইহুদী কিংবা খ্রিস্টানদের থাকতে দেননি। একে একে সবাইকে নির্বাসিত করেছেন।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইহুদীদেরকে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আরব জাহানে ইহুদীদের প্রধান ঘাঁটি খাইবার অধিকার করার পর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইহুদীদের শর্ত প্রদান করেছিলেন, যেকোনো মুহূর্তে আদেশ প্রদান করা মাত্র ইহুদীদেরকে খাইবার ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে হবে। ইহুদীরা এই শর্তেই খাইবারে বসবাস করে আসছিলো।
সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার খিলাফত মুবারক চলাকালে এই ইহুদীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠে। একদিন ইহুদীরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে এক ইমারতের ছাদ হতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, যার কারণে তিনি গুরুতর আহত হন এবং উনার একখানা হাত মুবারক ভেঙে যায়। ইহুদীদের এরূপ অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি এক মজলিস আহবান করে ইহুদীদের এসব সন্ত্রাসমূলক অপকর্মের কথা বর্ণনা করেন এবং ইহুদীদের খাইবার ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘কিতাবুশ শুরুত’ উনার মধ্যে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
নাজরানের খ্রিস্টানরা ইয়েমেন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাস করতো। এরা প্রথমে শান্ত থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই গোপনে বিদ্রোহ করার জন্য ঘোড়া ও অস্ত্র-শস্ত্র যোগাড় করে ফেলে। তখন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি সম্ভাব্য বিদ্রোহ দমনের জন্য নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে ইয়েমেন ছেড়ে ইরাকে চলে যাওয়ার নির্দেশ মুবারক প্রদান করেন।
এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি কাফিরদের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যার দ্বারা মুসলমানগণ উনাদের দ্বীনী ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ গ্রহণে বিধর্মীদের প্রতি ইনসাফ ও মানবিক দিকটি মোটেও উপেক্ষা করা হয়নি। বিদ্রোহের অপরাধে বহিষ্কার করা সত্ত্বেও বিধর্মীদের সম্পত্তির সমুদয় মূল্য পরিশোধ করা হয়েছিলো। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ফেদাকের ইহুদীদের বহিষ্কার করার সময় তাদের সমস্ত সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ প্রেরণ করেন এবং উক্ত বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদন অনুযায়ী সমস্ত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য বায়তুল মাল হতে নির্বাসিত ইহুদীদেরকে প্রদান করা হয়।
নাজরানের খ্রিস্টানদের বহিষ্কার করার সময়েও তাদের সাথে অত্যন্ত মানবিক আচরণ করা হয়। তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি লিখে দেয়া হয় এবং তার মধ্যে উল্লেখ থাকে যে, এই খ্রিস্টানরা ইরাক ও সিরিয়ার যে স্থানে যাবে, সে জায়গার শাসক তাদের কৃষিকার্য ও বসতির জন্য ভূমির ব্যবস্থা করে দিবেন এবং দীর্ঘ দুই বছর তাদের কাছ থেকে কোনো জিযিয়া কর আদায় করা হবে না। খ্রিস্টানরা যেকোনো মুসলমানের নিকট সাহায্য চাইলে মুসলমানগণ তাদেরকে সাহায্য করবে। খ্রিস্টানদের নিকট প্রদত্ত এই ফরমানে বিশিষ্ট ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের দস্তখত মুবারক রয়েছে। (তথ্যসূত্র: আল ফারুক, শিবলী নোমানী, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ২০৮-২০৯ পৃষ্ঠা)
দুনিয়ার কোনো যুগে, কোনো কালে বিদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি এধরনের সহানুভূতিশীল আচরণ করা হয়েছে, এর নজির কেউ দেখাতে পারবে না। কিন্তু তারপরও সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন ‘আশিদ্দাউ আলাল কুফফার’ তথা কাফিরদের প্রতি কঠোর।
বর্তমানে কাফিরদের প্রতি মুহব্বত পোষণকারী মুসলমানদের উচিত- সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার জীবনী মুবারক ফিকির করা। মুসলমানদের বোঝা উচিত- কাফিরদের কথায় কথায় মাথা নাড়লেই ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া যায় না, উদার হওয়া যায় না।