উসমানীয় শাসনের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আত্মত্যাগ এবং সিঙ্গাপুর গণহত্যার করুণ ইতিহাস
ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা যখন তাদের ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে তখন স্থানীয় মুসলিম যুবকরা শক্তিশালী ও কর্মঠ হওয়ায় তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হতো। যোগ না দিলে গোপনে হত্যা কিংবা পরিবারসহ উচ্ছেদ হতে হতো তাদের। তাই বাধ্য হয়েই তারা বৃটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতো।
সে সময় সিন্ধ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে কিছু মুসলমানকে ব্রিটিশদের পঞ্চম পদাতিক বাহিনীতে যোগ করা হয়। তাদের সবারই ভারতের ভেতরেই দায়িত্ব পড়ার কথা ছিলো। কিন্তু ১৯১৪ সালের ১০ অক্টোবর হঠাৎ করেই পঞ্চম পদাদিক সেনাদের জাহাজে করে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। তাদের সিঙ্গাপুরের আলেকজান্দ্রিয়া ব্যারাকে রাখা হয়।
সেখানে যাওয়ার পরেই, এই মুসলিম সিপাহীদের দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করানো হয়। অধিকাংশ মুসলিম সেনার কয়েক মাসের খাটুনিতে শরীরের অবনতি হয়, দায়িত্বরত ব্রিটিশ অফিসার বিদ্বেষবশত এগুলো তোয়াক্কা না করে মুসলিম সেনাদের আরও বেশি কাজ করিয়ে নিতো। পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস আসলে মুসলমান সেনারা রোযা রাখতেন। তখন ব্রিটিশরা উনাদের দিয়ে আরো বেশি কাজ করিয়ে নিতো। যাতে উনারা রোযা রাখতে না পারেন। এছাড়া, সিঙ্গাপুরে স্বল্প পয়সায় মুসলিম সেনারা নিজেদের কাছে থাকা ইন্ডিয়ান রুপি সিঙ্গাপুরের ডলারের তুলনায় দাম অনেক কম হওয়ায় নিজেরাও খাবার বাইরে থেকে কিনে খাবার মতো অবস্থা ছিলো না।
সে সময় আমেরিকায় অবস্থান করা ভারতীয় মুসলিমরা ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন লেখা পুরো দুনিয়ায় গোপনে বিভিন্ন জাহাজে করে ছড়িয়ে দিতেন। এরকম কিছু কাগজ গোপনে সিঙ্গাপুর পোর্ট মুসলিম সেনাদের কাছে এসে পৌঁছে। এই কাগজে তৎকালীন একমাত্র মুসলিম শাসন উসমানীয় সালতানাতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র আর মিশর থেকে তুরস্কে আক্রমণের পরিকল্পনার কথা লেখা ছিলো। এটি শোনার পর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মুসলিম সেনারা। সেখানকার দায়িত্বরত ব্রিটিশ কর্মকর্তা হঠাৎই ঘোষণা করে যে, পঞ্চম পদাতিক বাহিনীর মুসলিম সেনাদের হংকং নিয়ে যাওয়া হবে।
কিন্তু পঞ্চম পদাতিক বাহিনীতে থাকা সুবেদার খান, জেমিদার আলী খান আর চিশতী খান গোপন সংবাদ মারফত শুনতে পান, তাদেরকে আসলে তুরস্কে পাঠানো হবে উসমানীয় সালতানাতের মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। তৎক্ষনাৎ উনারা ব্যারাকে ফিরে গিয়ে সব মুসলমান সেনাকে নিয়ে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নেন। মুসলমান সেনারা অপেক্ষা করছিলেন যে, আসলেই কি তাদের উসমানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো হবে কি-না?
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সাল। সকালের প্যারেডে ব্রিটিশ অফিসার তাদের বলে আজই তাদের জাহাজে করে ট্রান্সফার করা হবে। তখন মুসলিম সেনাদের একজন কমান্ডার ব্রিটিশ অফিসারকে জিজ্ঞাসা করে যে, তাদেরকে কি হংকং নিয়ে যাওয়া হবে কিনা। কিন্তু এর কোনো জবাব আসে না। মুসলমান সেনাদের আর কোনো কিছু বোঝার বাকি থাকে না, তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিকাল ৩টা ৩০ মিনিট, বন্দরের জেটিতে জাহাজ এসে পৌঁছেছে। ব্যারাকের যেখানে অস্ত্র রাখা হয় সেখানে ঢুকে মুসলিম সেনারা হাতে অস্ত্র নেয় এবং খোলা আকাশের দিকে লক্ষ্য করে একটা গুলি করে। অন্যসব সিপাহী তখন বিদ্রোহ শুরু করে। ৩ দিন ধরে চলা এই বিদ্রোহে ৪৬ জন ব্রিটিশ মারা যায় এবং সিঙ্গাপুর মুসলমান সেনাদের দখলে চলে যায়।
এ পরিস্থিতি দেখে রাশিয়া ও ফ্রান্স ব্রিটিশদের সহযোগীতায় সেনা পাঠায়। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে মুসলমান সেনারা সবাই বন্দি হন। বন্দি করার পর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সালে আলেকজান্দ্রিয়া পার্কে ৫০০ মুসলিম সেনাকে গুলি করে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। এই নির্মম হত্যাকান্ডে ব্রিটিশদের পাশাপাশি ইউরোপীয়ান সাধারণ নাগরিকরাও অংশ নিয়েছিলো। তারা এটিকে বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ আখ্যায়িত করেছিলো। নাউযুবিল্লাহ!
উল্লেখ্য, শহীদ হওয়া মুসলিম সিপাহীরা কেউই দূরদেশে থাকা উসমানীয় সালতানাতের মুসলিমদের কখনও দেখেওনি, তাদের সঙ্গে জাতি, গোত্র, ভাষা কোনো কিছুরই মিল ছিলো না। কিন্তু তাদের ভেতর ছিলো মুসলিম উম্মাহ, মুসলিম শাসন এবং সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার প্রতি অগাধ ভালোবাসা।