বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের অবদান: ইলম অর্জন ও প্রচার প্রসার (১ম পর্ব)

দ্বীন ইসলাম উনার প্রাথমিক সময়ে বিশেষ কার্যক্রম:



নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইলম অর্জনকে অত্যাধিক গুরুত্ব মুবারক দিতেন। আদেশ এবং নির্দেশনা মুবারক প্রদান করতেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আল ঊলা কুবরা আলাইহাস সালাম তিনি উনার মহাসম্মানিত জিন্দেগী মুবারকে সবাইকে ইলম অর্জনের জন্য তাগিদ মুবারক দিয়ে গেছেন। হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মহাসম্মানিত হুজরা শরীফ মুবারক ছিলেন ইলম উনার খনি মুবারক।

পবিত্র মক্কা শরীফ উনার অত্যন্ত নিরিবিলি স্থানে অবস্থিত হযরত আরকাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বাড়ি মুবারকে প্রতিষ্ঠা করা দারুল আরকাম মুবারক। যা ইলম অর্জনের একটি আলোকবর্তিকা ছিলো। এখানে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা একত্রিত হয়ে সম্মানিত ইলম মুবারক গ্রহণ করতেন, চর্চা মুবারক করতেন। সুবহানাল্লাহ!

যারা প্রাথমিকভাবে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করতেন উনারা দারুল আরকাম শরীফেই পবিত্র ইলম মুবারক অর্জন করতেন। নতুন কোন গোত্রের লোক দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করলে, তাদের শিক্ষা দানের জন্য অভিজ্ঞ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রেরণ করা হতো। এভাবে গোত্রে গোত্রে বিভিন্ন ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা আয়তন গড়ে উঠতে থাকে। মহাসম্মানিত হিজরত মুবারক উনার পর পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মহাপবিত্র মসজিদে নববী শরীফ ইলম উনার এক মহাকেন্দ্র হিসেবে রূপ লাভ করেন।

মসজিদে নববী শরীফ উনার প্রাঙ্গণে ‘সুফফা’ নামে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের বহু মানুষ এখানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য আসতেন। অনেক ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন আবাসিক ছাত্র-শিক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় বহন করা হতো পবিত্র বাইতুল মাল থেকে। কূফা, বসরা, সিরিয়া, মিশর, রোম, পারস্য প্রভৃতি স্থান থেকে আগত শিক্ষার্থীরা মদীনা শরীফে এসে ভীড় জমাতেন।

সভ্যতার মূলত সৃষ্টিই হয়েছে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অপরিসীম দয়া ইহসান মুবারকে। তিনি নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও শিক্ষা বিস্তারে এত গুরুত্ব দিতেন যে, পবিত্র বদরের জিহাদে শিক্ষিত যুদ্ধ বন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেছিলেন, কয়েকজন মুসলমানকে শিক্ষা দান করার মাধ্যমে।



হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের পদক্ষেপ:

শিক্ষা বিস্তার ও উন্নয়নে হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম উনারা অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষা বিস্তার ও প্রসারে উনাদের অবদান হচ্ছেন, সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার অসামান্য পরামর্শ মুবারকে পবিত্র কুরআন শরীফ উনাকে গ্রন্থাকারে একত্রে সংকলনের মহান দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারাও এই পবিত্র কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি পঠনরীতিতে পবিত্র কুরআন শরীফ সংকলন মুবারক করেন।

হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন আলাইহিমুস সালাম উনাদের যুগে রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্বীন ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে শিক্ষা বিস্তারের জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কোথাও সেনাবাহিনী প্রেরণের সময় সেনাপ্রধান নিয়োগ করা হতো- শিক্ষিত অভিজ্ঞ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিকে। উনারা বিজিত অঞ্চলে শিক্ষা দানে ব্যাপৃত হতেন। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসাধারণকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য মক্তব ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা দানের জন্য উপযুক্ত উস্তাদ নিয়োগ করতেন এবং বাইতুল মাল থেকে উনাদের বেতন-ভাতা দিতেন।

বাস্তুহারা অনগ্রসর বেদুইনদের জন্য সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ অধ্যয়নে গাফিলতিতে শাস্তির ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিলো। সুবহানাল্লাহ!



উমাইয়া শাসকদের পদক্ষেপ:

উমাইয়া আমলের শুরুতে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মুবারক তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিস্তারের কাজ গুরুত্ব সহকারে চলতে থাকে। উনাদের আমলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাট অগ্রগতি সাধিত হয়।



পবিত্র হাদীছ শরীফ সংকলন:


উমাইয়া শাসক হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সময়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পবিত্র হাদীছ শরীফ সংকলনের কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পাদন করা হয়। এ সময় পবিত্র হাদীছ শরীফ শিক্ষার ব্যাপক অগ্রগতি হয়। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বহু সংকলন এ সময় রচিত হয়।



শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন:


সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলে পবিত্র হাদীছ শরীফ চর্চা ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব শিক্ষাকেন্দ্রে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা গ্রহণ করে। দামেস্ক, কূফা, বসরা, পবিত্র মক্কা শরীফ, পবিত্র মদীনা শরীফ প্রভৃতি অঞ্চলে শিক্ষা কেন্দ্রগুলো ছিলো খুবই বিশাল। সেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভের জন্য বিশ্বের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতো।

-মুহম্মদ শাহজালাল।