নারিকেল দ্বীপে স্থায়ী সেনানিবাসের প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশের একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব ও ভূ-খন্ডের নিরাপত্তার প্রতীক বঙ্গোপসাগরের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ নারিকেল দ্বীপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাফ নদী, টেকনাফ সীমান্ত এবং সংলগ্ন আন্তর্জাতিক নৌসীমায় যে অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি নতুন সমীকরণ উন্মোচন করেছে। মিয়ানমারের ভেতরে চলমান গৃহযুদ্ধ, দেশটির সীমান্তরক্ষী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুদীর্ঘ সংকট এবং বঙ্গোপসাগরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে নারিকেল দ্বীপ দ্বীপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বা পূর্ণাঙ্গ সামরিক বলয় নিশ্চিত করা এখন কেবল একটি প্রতিরক্ষাগত প্রস্তাব নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অনিবার্য তাগিদ।
ভৌগোলিক দিক থেকে নারিকেল দ্বীপ মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এক অতন্দ্র প্রহরী। বিগত কয়েক বছরে মিয়ানমার সীমান্ত ও সংলগ্ন জলসীমায় ঘটে যাওয়া বেশ কিছু অনাকাঙিক্ষত ঘটনা যেমন সীমান্ত আকাশসীমা লঙ্ঘন, নাফ নদীতে মাছ ধরার ট্রলারে গুলিবর্ষণ এবং নৌপথ অবরুদ্ধের মতো ঝুঁকি প্রমাণ করে যে কেবল কোস্ট গার্ড বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়মিত টহলের মাধ্যমে এই সংবেদনশীল দ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিছিদ্র রাখা কঠিন। যেকোনো জরুরি বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে মূল ভূখ- থেকে দ্বীপে দ্রুত সামরিক সহায়তা পৌঁছানো সময়সাপেক্ষ বিষয়। দ্বীপে একটি স্থায়ী সেনাক্যাম্প বা সেনানিবাস থাকলে তা যেকোনো সম্ভাব্য বহিরাগত উসকানি বা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় প্রতিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা (উবঃবৎৎবহপব) হিসেবে কাজ করবে।
কেবল সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, ভূ-রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের কাঠামোগত সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গোপসাগর আজ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই বাংলাদেশের একচ্ছত্র নৌসীমায় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ঊঊত) ও সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। সেনাবাহিনীর সুনিয়ন্ত্রিত নজরদারি বরং দ্বীপটির অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন রোধ, অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে দ্বীপটির অধিবাসীদের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর দ্রুত ব্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান সহজতর হবে।
জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির মূল ভিত্তি হলো- দেশের ভৌগোলিক অখ-তা অক্ষুন্ন রাখা। সেনাসদরের কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং সরকারের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নীতির সমন্বয়ে সেন্ট মার্টিনে সেনাবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সার্বভৌম ভূখ-ের সুরক্ষায় এক চুলও ছাড় না দেয়ার সংকল্প বাস্তবায়নে এটি হতে পারে এক দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।