মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানার্থে ও মুহব্বতে খুশি প্রকাশ করে খরচ করার ফজিলত(৬০)
মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি মুহব্বত ও তা'যীম প্রদর্শনপূর্বক আনন্দ প্রকাশ করা সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ'ইয়াদ শরীফ (عَمَلُ مَوْلِدِ النَّبِيِّ ﷺ) ফালইয়াফরাহু শরীফ (فَلْيَفْرَحُوا شَرِيفٌ) 'মজলিসুস সালাওয়াত' (مجلس الصلوات) বা দরুদ আসর বা ‘দরূদের সমবেত বা ইজতিমায়ী মজলিস বা যৌথভাবে দরূদ পাঠ (حِلَقُ الذِّكْرِ وَالصَّلَاةِ ),খরচ করা (عَمَلِ الْوَلَائِمِ فِي الْمَوْلِدِ), খানা খাওয়ানো (صَنَعَ لَنَا مَوْلِدًا) এবং কাসিদা (قِرَاءَةُ الْقَصَائِدِ) পাঠ সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু,তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের উনাদের নিয়মিত মহান আমল। যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ শরীফ সম্মত।


হাম্বলী ফকীহ (আইনবিদ), অন্ধ হাফিজ ইমাম জালালুদ্দীন আবূ যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু ইউসুফ ইবনু ইয়াহইয়া আস-সারসারী আল-আনসারী রহমতুল্লাহ আলাইহি (জন্ম ৫৮৮ হিজরীতে বাগদাদে -শাহাদাত: ৬৫৬ হিজরীতে হালাকু খানের নেতৃত্বে তাতার (মঙ্গোল) বাহিনী যখন বাগদাদ আক্রমণ করে, তখন এই অন্ধ প্রবীণ ওলী ও আলিম আক্রমণকারী সৈন্যদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন।
(مَوْلِدِ)
মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ও খালিক্ব মালিক্ব রব মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে মক্ববুল হওয়ার,উনাদের রেজামন্দি সন্তুষ্ঠি পাওয়ার আমল।যা অলৌকিকভাবে মহাসত্য প্রমাণিত হল ।
স্বপ্নে মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে দেখার অলৌকিকত্ব ও সত্যতার বিষয়সমূহ সরাসরি বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। ইসলামী আক্বীদা ও ফিকহের আলোকে এই হাদীসগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা, ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহ উনার ৩টি স্বপ্ন এবং মিলাদ শরীফের সাথে এর সংযোগ নিচে কুরআন-সুন্নাহ ও উসূলের অকাট্য নীতি অনুযায়ী তুলে ধরা হলো:

ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহ আলাইহি উনার ৩টি স্বপ্ন
১)কপালে চুম্বনের স্বপ্ন (جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا عَنَّا بِمَا مَدَحْتَنَا بِهِ فِي قَصَائِدِكَ وَمَوْلِدِكَ): ইমাম ইউসুফ বিন ইসমাইল আন-নাভহানি রহমতুল্লাহ উনার'আল-কাওয়াকিবুল আনওয়ার' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন

«وَمِنْهَا مَا ذُكِرَ فِي مَنَاقِبِ الشَّيْخِ يَحْيَى الصَّرْصَرِيِّ رَحِمَهُ اللهُ أَنَّهُ رَأَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَنَامِهِ، فَأَقْبَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَبَّلَ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَقَالَ لَهُ: جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا عَنَّا بِمَا مَدَحْتَنَا بِهِ فِي قَصَائِدِكَ وَمَوْلِدِكَ»
"ওয়া মিনহা মা যুকিরা ফী মানাক্বিবিশ-শাইখি ইয়াহইয়া আস-সরসারিয়্যি রাহিমাহুল্লাহু আন্নাহু রআন-নাবিয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ফী মানামিহী, ফআক্ববালা 'আলাইহিন-নাবিয়্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ওয়া ক্বাব্বালা বাইনা 'আইনায়হি, ওয়া ক্বালা লাহু: জাযাকাল্লাহু খাইরান 'আন্না বিমা মাদাহতানা বিহী ফী ক্বাসাইদিকা ওয়া মাওলিদিক।"
বাংলা অনুবাদ:
"এবং তাঁর বরকতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হলো তা—যা শায়খ হযরত ইমাম ইয়াহইয়া আস-সারসারী রহমতুল্লাহ আলাইহি — তিনি স্বপ্নে মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে উনাকে প্রত্যক্ষ করেন। উনার দিকে এগিয়ে এলেন এবং উনার দুই চোখের মাঝে চুম্বন করলেন। আর উনাকে বললেন: 'তুমি তোমার মাওলিদে কাছিদা এ আমাদের যে প্রশংসা করেছ, তার জন্য আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে তোমাকে উত্তম প্রতিফল দান করুন।'"


২)মুখ মুবারকে চুম্বন ও শাহাদাতের পূর্বাভাস:

('কাসীদা মনামিয়্যাহ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ فِي النَّوْمِ مَرَّةً ... فَقَبَّلْتُ فَاهُ الْعَذْبَ تَقْبِيلَ مُشْتَاقِ وَلَوْ أَنَّنِي أُوتِيتُ رُشْدِيَ نَائِمًا ... لَقَبَّلْتُ مَمْشَاهُ الْكَرِيمَ بِآمَاقِي فَبَشَّرَنِي مِنْهُ بِأَزْكَى شَهَادَةٍ ... بِهَا جَبْرُ كَسْرِي يَوْمَ فَقْرِي وَإِمْلَاقِي بِمَوْتٍ سَعِيدٍ فِي كِتَابٍ وَسُنَّةٍ ... فَلَانَتْ لِبُشْرَاهُ شَرَاسَةُ أَخْلَاقِي وَهَا أَنَا ذَا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ ... مُقِرٌّ لِبُشْرَاهُ بِأَثْبَتِ مِصْدَاقِ بِأَنِّي عَلَى حُسْنِ اعْتِقَادِ ابْنِ حَنْبَلٍ ... مُقِيمٌ وَإِنْ قَامَ الْعِدَى لِي عَلَى سَاقِ أَقِرُّ بِأَنَّ اللَّهَ مِنْ فَوْقِ عَرْشِهِ ... يُقَدِّرُ آجَالًا وَيَقْضِي بِأَرْزَاقِ
১. রআইতু রাসুলুল্লাহি ফিন-নাওমি মাররাতান ... ফাকাব্বালতু ফাহুল 'আযবা তাকবীলা মুশতাক্ব। ২. ওয়া লাউ আন্নানী উতীতু রুশদী নাইমান ... লাকাব্বালতু মামশাহুল কারীমা বি-আমাক্বী। ৩. ফাবাশশারানী মিনহু বি-আযকা শাহাদাতিন ... বিহা জাবরু কাসরী ইয়াউমা ফাকরী ওয়া ইমলাক্বী। ৪. বি-মাওতিন সাঈদিন ফী কিতাবিন ওয়া সুন্নাতিন ... ফালানাত লি-বুশরাহু শারাসাতু আখলাক্বী। ৫. ওয়া হা আনা যা ওয়াল-হামদু লিল্লাহি ওয়াহদাহু ... মুক্বিররুন লি-বুশরাহু বি-আসবাতি মিসদাক্বী। ৬. বি-আন্নী আলা হুসনি'তিকাদি ইবনি হানবালিন ... মুক্বীমুন ওয়া ইন কামাতিল 'ইদা লী আলা সাক্বী। ৭. উ ক্বিররু বি-আন্নাল্লাহা মিন ফাওক্বি আরশিহী ... ইউক্বাদ্দিুরু আজালান ওয়া ইয়াক্বযী বি-আরযাক্বী।

১. আমি স্বপ্নে একবার মহাসম্মানীত রসূল হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে দেখেছি, অতঃপর এক ব্যাকুল আকুলতায় উনার মিষ্টি মুখ মোবারক চুম্বন করেছি। ২. যদি ঘুমাতেও আমার পূর্ণ জ্ঞান থাকত, তবে আমি চোখের পাতা দিয়ে উনার সম্মানিত চরণ মুবারকের পদচিহ্নে চুমু খেতাম। ৩. অতঃপর তিনি আমাকে পরম পবিত্র শাহাদাতের সুসংবাদ দিলেন, যার মাধ্যমে আমার পরম অভাব ও দারিদ্র্যের দিনে আমার ভগ্নদশা দূর হবে। ৪. কিতাব ও সুন্নাহর ওপর এক সৌভাগ্যমণ্ডিত মৃত্যুর সুসংবাদ; আর তাঁর সুসংবাদে আমার চরিত্রের কঠোরতা কোমল হয়ে গেল। ৫. আর এই তো আমি, কেবল আল্লাহর প্রশংসায় রত; তাঁর দেওয়া এই সুসংবাদকে সবচেয়ে সত্য হিসেবে স্বীকার করছি। ৬. যে আমি ইমাম আহমদ ইবনে হানবলের উত্তম আকীদার ওপর অটল রয়েছি, যদিও শত্রুরা আমার বিরুদ্ধে সশস্ত্রে দাঁড়িয়ে যায়। ৭. আমি স্বীকার করি যে, আল্লাহ তাঁর আরশের ওপর থেকে হায়াত ও রিজিক নির্ধারণ ও বণ্টন করেন।

৩)মৃত্যুর পরবর্তী স্বপ্ন (উচ্চ মাকামের সাক্ষ্য): উনার ইন্তেকালের পর তৎকালীন অন্য আলেম ও বুজুর্গগণ উনাকে স্বপ্নে অত্যন্ত উচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদায় এবং জান্নাতী নেয়ামতের মধ্যে দেখতে পান,

وَرُؤِيَ بَعْدَ مَوْتِهِ فِي المَنَامِ، فَقِيلَ لَهُ: مَا فَعَلَ اللهُ بِكَ؟ فَقَالَ: غُفِرَ لِي، بِبُكَائِي عَلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ، وَبِأَشْعَارِي فِي مَدْحِهِ.
"ওয়া রুঈয়া বা'দা মাউতিহী ফিল মানাম, ফাক়ীলা লাহু: মা ফা'লাল্লাহু বিকা? ফাকালা: গুফিরা লী, লিবুকায়ী 'আলা রাসূলিল্লাহি ﷺ, ওয়া বি-আশআরী ফী মাদহিহি।"

"এবং উনার ইন্তেকালের পর উনাকে স্বপ্নে দেখা হলো।উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো: 'আল্লাহ আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?' তিনি বললেন: 'আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে—মহাসম্মানীত রসূল হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-েউনার ওপর আমার কান্নাকাটি এবং উনার শানে রচিত আমার কবিতাগুলোর উসিলায়।'"
১. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (البداية والنهاية)
লেখক: হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.)
সময়কাল: ৭০১ হিজরী – ৭৭৪ হিজরী (মতান্তরে ৭৭১ হিজরী)
বৈশিষ্ট্য: সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত পর্যন্ত সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ।
২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (سير أعلام النبلاء)
লেখক: ইমাম শামসুদ্দীন আল-যাহাবী (রহ.)
সময়কাল: ৬৮৩ হিজরী – ৭৪৮ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তী যুগের মণীষীদের বর্ণাঢ্য জীবনী সংবলিত এক অনন্য বিশ্বকোষ।
৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান (وفيات الأعيان)
লেখক: ইবন খাল্লিকান (রহ.)
সময়কাল: ৬০৮ হিজরী – ৬৮১ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: মুসলিম ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুর সাল ও জীবনী নিয়ে রচিত একটি মৌলিক আকর গ্রন্থ।
৪. আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত (الوافي بالوفيات)
লেখক: সালাহুদ্দীন খলিল আস-সাফাদী (রহ.)
সময়কাল: ৬৯৬ হিজরী – ৭৬৪ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: এটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বিশাল ও বিস্তৃত জীবনী গ্রন্থ (প্রায় ৩০ খণ্ডে সমাপ্ত)।
৫. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাহ (ذيل طبقات الحنابلة)
লেখক: ইমাম ইবনে রজিব আল-হানবালী (রহ.)
সময়কাল: ৭৩৬ হিজরী – ৭৯৫ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: হানাবলী মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহদের জীবনী জানার অন্যতম প্রধান উৎস।
৬. তাবাকাতুশ শাফিয়্যিয়্যাতুল কুবরা (طبقات الشافعية الكبرى)
লেখক: ইমাম তাজউদ্দীন আস-সুবকী (রহ.)
সময়কাল: ৭২৭ হিজরী – ৭৭৬ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: শাফেয়ী মাযহাবের বড় বড় আলেম ও ইমামদের বিস্তারিত জীবনী এতে সংকলিত হয়েছে।
৭. মিরআতুল জিনান ওয়াইবরাতুল ইয়াকজান (مرآة الجنان وعبرة اليقظان)
লেখক: হাফেজ আফিফুদ্দীন আব্দুল্লাহ আল-ইয়াফিঈ (রহ.)
সময়কাল: ৬৯৮ হিজরী – ৭৬৮ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: ইতিহাস ও সুফী-সাধকদের জীবনীর এক চমৎকার সংমিশ্রণ।
৮. আদ্-দুরারুল কামিনাহ (الالدرر الكامنة)
লেখক: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)
সময়কাল: ৭৭৩ হিজরী – ৮৫২ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: বিশেষ করে হিজরী অষ্টম শতকের (৮০০ হিজরীর কাছাকাছি সময়ের) বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে এটি রচিত।
৯. শাজারাতুয যাহাব (شذرات الذهب)
লেখক: ইবনুল ইমাদ আল-হানবালী (রহ.)
সময়কাল: ১০২৩ হিজরী – ১০৮৯ হিজরী
বৈশিষ্ট্য: হিজরী প্রথম শতক থেকে দশম শতক পর্যন্ত প্রতি বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও মৃত ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মূল আরবি বর্ণনায় কী শব্দ ছিল?
কিতাবের মূল আরবি রেওয়ায়েত অনুযায়ী মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহ আলাইহিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: (جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا عَنَّا بِمَا مَدَحْتَنَا بِهِ فِي قَصَائِدِكَ وَمَوْلِدِكَ)
“তুমি তোমার মাওলিদে ও কাসিদায় আমাদের যে প্রশংসা করেছ, আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে তোমাকে তার উত্তম প্রতিদান দিন।”
ইবারতের একেবারে শেষ শব্দটি লক্ষ করুন: «وَمَوْلِدِكَ» (ওয়া মাওলিদিকা)। এটি মূলত 'মৌলিদ' (مَوْلِد) শব্দ, যা আরবী ব্যাকরণ ও অর্থগতভাবে 'মিলাদ' (مِيلَاد) শব্দেরই আসল রূপ (উভয় শব্দই একই মূলাক্ষর ও-ل-দ থেকে উৎপন্ন, যার মূল অর্থ জন্ম)। আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে 'মৌলিদ' শব্দটির 'ওয়াও' (و) অক্ষরটি জেরের কারণে 'ইয়া' (ي) হয়ে 'মিলাদ' রূপ ধারণ করে, তাই এ দুটির মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই।
আরব বিশ্বে মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ায় তাশরীফ মুবারক সংক্রান্ত আলোচনার মাহফিল বা কিতাবকে বলা হয় 'মাওলিদ' । আমাদের উপমহাদেশে (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে) ফারসি ও উর্দু ভাষার প্রভাবে এই 'মাওলিদ' শব্দটিই সাধারণ মানুষের মুখে 'মিলাদ' এবং সম্মানার্থে 'মিলাদ শরীফ' হিসেবে রূপান্তরিত ও প্রচলিত হয়েছে।
ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহ আলাইহি-এর স্বপ্নে "মিলাদ শরীফ" নামক হুবহু বাংলা/উর্দু পরিভাষাটি না থাকলেও, স্বয়ং মহাসম্মানীত নবীজী ﷺ যে শব্দটির প্রশংসা করেছেন তা হলো "মৌলিদ"—যার হুবহু অর্থ ও তাৎপর্য হলো বর্তমান যুগের প্রচলিত "মিলাদ শরীফ"। অতএব, পরিভাষা ভিন্ন হলেও বিষয়বস্তু ও মূল চেতনাটি এক এবং অভিন্ন।
এই স্বপ্নে মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুসংবাদ দেওয়ার ঘটনাটি যে একটি বাস্তব অলৌকিকত্ব (কারামত), তা সহীহ হাদীসের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সহীহ বুখারীর দলীল:
মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন:
«مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِي»
বাংলা উচ্চারণ: “মান রআনী ফিল মানামি ফাক্বদ রআনী, ফাইন্না আশ-শাইত্বনা লা ইয়াতামাচ্ছালু বী।”
অনুবাদ: “যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে মূলত আমাকেই দেখল। কারণ, শয়তান আমার রূপ (আকৃতি) ধারণ করতে পারে না।”
হযরত ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস ও ওলী ছিলেন, তাই স্বপ্নে মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁর «مَوْلِدِ» (মৌলিদ/মিলাদ) এবং কাসিদার প্রশংসা করা এবং তাঁকে চুম্বন করা শতভাগ সত্য ও রূহানী অনুমোদনের অলৌকিক বহিঃপ্রকাশ।
ইবারতের আলোকে মিলাদ শরীফের গ্রহণযোগ্যতা ও উসূলের সামঞ্জস্য:
এই মোবারক ইবারতটি প্রমাণ করে যে, মহাসম্মানীত রসূল নূরে মুজাসসাম, হাজির ও নাজির, হায়াতুন্নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুহব্বতে খুশি প্রকাশ করা স্বয়ং উনার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় ও মকবুল আমল। মহব্বত, আধ্যাত্মিকতা ও রূহানী মাকামের বিচারে এই ঘটনাটি পরম সৌভাগ্যের এবং আনন্দের এক অকাট্য অনুপ্রেরণার দলীল। স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ইবারতে «مَوْلِدِ» (মৌলিদ বা মিলাদ) শব্দ উচ্চারণ করে উম্মতের মিলাদ শরীফের মজলিস ও কাসীদাকে দুআ ও চুম্বনের মাধ্যমে নিজের পছন্দনীয় আমল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনের আলোকপাত ও সুসংবাদ (আল-বুশরা):
মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ (সত্য স্বপ্ন) দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে।” (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪)
হাদীস ও তাফসীরের পরিভাষায় এখানে "সুসংবাদ (আল-বুশরা)" বলতে মুমিনের সেই সত্য স্বপ্নকে বোঝানো হয়েছে, যা সে নিজে দেখে অথবা অন্য কোনো সালেহ (নেককার) ব্যক্তি তার জন্য দেখে। সুতরাং, হযরত ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজে এবং উনার ইন্তেকালের পর উনার সম্পর্কে অন্য আলেম ও সালেহ ব্যক্তিগণ যে ধারাবাহিক স্বপ্ন দেখেছেন, তা সূরা ইউনুসের ৬৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী মহান আল্লাহ পাকের দেওয়া সেই পবিত্র "সুসংবাদ বা বুশরা"-এর অন্তর্ভুক্ত ও মহাসত্য প্রমাণিত।

স্বপ্নের পারস্পরিক জোরালো মিলন বা "তাওয়াতু আল-রুয়া" (تَوَاطُؤُ الرُّؤْيَا):
عَنْ اِبْنِ عُمَرَ أَنَّ رِجَالاً مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أُرُوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْمَنَامِ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: ‏"إِنِّي أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّইَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ‏"‏
“আন ইবনি ওমারা আন্না রিজালাম মিন আস-হাবিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা উরু লাইলাতাল কাদরি ফিল মানামি ফিস সাব'ইল আওয়াখিরি, ফাকালা রাসূলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: 'ইন্নি আরা রু'ইয়াকুম ক্বদ তাওয়াত্বায়াত ফিস সাব'ইল আওয়াখিরি, ফামান ক্বানা মুতাহাররিয়াহা ফালইয়াতাহাররাহা ফিস সাব'ইল আওয়াখিরি'।”
অনুবাদ: হযরত ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম রমজানের শেষ সাত রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন: “আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তোমাদের সবার স্বপ্ন শেষ সাত রাতের ব্যাপারে একমত বা একসূত্রে মিলিত হয়েছে (تَوَاطَأَتْ - তাওয়াত্বায়াত)।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং २०१५)
সুতরাং, হযরত ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাসীদা ও মাওলিদের ব্যাপারে উনার নিজের দেখা স্বপ্ন, উনার মুখের কাসীদা এবং মৃত্যুর পর অন্য বুজুর্গদের দেখা স্বপ্ন—সবই এই "তাওয়াতু আল-রুয়া" বা স্বপ্নের একসূত্রে জোরালো মিলনের অকাট্য দলীল, যা অলৌকিকভাবে মহাসত্য প্রমাণিত।

হাদীসভিত্তিক তাহকীক:
উসূলে ফিকহ ও হাদীসের পরিভাষায় একে বলা হয় "তাওয়াতু আল-রুয়া" (تَوَاطُؤُ الرُّؤْيَا — স্বপ্নের পারস্পরিক জোরালো মিলন)। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির স্বপ্ন এক হওয়ার কারণে সেটিকে একটি শরয়ী সিদ্ধান্ত (লাইলাতুল কদর খোঁজার নির্দেশ) হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ঠিক একইভাবে, ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং পরবর্তী অন্য আলেম ও সালেহ ব্যক্তিদের স্বপ্নের এই নিখুঁত মিল প্রমাণ করে যে—এই বিষয়টি খালিক্ব মালিক্ব রব মহান আল্লাহ পাক ও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে কবুল ও মক্ববুল।



অলৌকিকত্ব ও সামঞ্জস্য:
সহীহ বুখারীর হাদীস অনুযায়ী, শয়তান নবীজীর রূপ নিতে পারে না। তাই স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র জবান মুবারক থেকে «مَوْلِدِكَ» (তোমার মাওলিদ/মিলাদ)-এর প্রশংসা এবং সুসংবাদ পাওয়া মিলাদ শরীফের পক্ষে সবচেয়ে বড় অলৌকিক ও রূহানী অনুমোদন।
যখন কোনো ব্যক্তির সুসংবাদ অন্য কোনো নেককার বা সালেহ ব্যক্তি স্বপ্নে দেখেন, তখন সেই স্বপ্নের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বহুগুণ মজবুত হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, এই মিলাদ শরীফের মজলিসকে গুরুত্ব দেওয়া ও এতে অংশগ্রহণ করা এবং সম্পদ খরচ করার কবুলিয়ত আধ্যাত্মিক জগতে সর্বজনবিদিত ছিল, যা মূলত মহান আল্লাহ ও উনার রসূলের রেজামন্দি হাসিল করার এবং জান্নাতী হওয়ার এক সুমহান আমল।


৩. স্বপ্ন যে নবুওয়াতের অংশ ও মুবাশশিরাত (৩য় স্বপ্নের প্রমাণ)
হযরত ইমাম আস-সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইন্তেকালের পর ৩য় ব্যক্তি যে জান্নাতী সুসংবাদের স্বপ্ন দেখলেন, তা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীস দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত:
«لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ‏.‏ قَالُوا وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ قَالَ: ‏الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ»
অনুবাদ: হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন: "নবুওয়াতের আর কোনো অংশ অবশিষ্ট নেই, কেবল 'মুবাশশিরাত' (সুসংবাদ) ব্যতীত।" সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, মুবাশশিরাত কী? তিনি বললেন: "নেককার বা সত্য স্বপ্ন।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)
«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ جُজْءٌ مِنْ سِتَّةِ وَأَرْبَعِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ»
বাংলা উচ্চারণ: “আর-রু’ইয়া আস-সালেহাতু জুযউম মিন সিততাতিন ওয়া আরবাঈনা জুযআম মিনান নুবuওয়্যাহ।”
অনুবাদ: “মুমিনের সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ (৪৬) ভাগের এক ভাগ।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৩)
হাদীসভিত্তিক তাহকীক:
ইমাম আস-সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইন্তেকালের পর অন্য সালেহ ব্যক্তির দেখা ৩য় স্বপ্নটি মূলত এই হাদীস শরীফে বর্ণিত পবিত্র "মুবাশশিরাত"-এর হুবহু বহিঃপ্রকাশ। এই অলৌকিক ঘটনাটি উম্মতের জন্য এটিই প্রমাণ করে যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার «مَوْلِدِكَ» (মাওলিদ/মিলাদ) মজলিস অত্যন্ত বরকতময় এবং উনাদের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের একটি সরাসরি রূহানী মাধ্যম, যা অলৌকিকভাবে মহাসত্য প্রমাণিত।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাদীস শরীফের এই ৩টি অকাট্য মূলনীতির আলোকে প্রমাণিত হয় যে:
১. শয়তান নবীজীর রূপ নিতে পারে না, তাই স্বপ্ন দুটি শতভাগ সত্য।
২. ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির স্বপ্নের মিলকে স্বয়ং নবীজী দলীল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন (তাওয়াতুআত)।
৩. মৃত্যুর পর ওলীদের জান্নাতী মাকাম দেখা সরাসরি হাদীসের নির্দেশিত "মুবাশশিরাত" (সুসংবাদ)।
অতএব, আপনার তুলে ধরা ৩টি স্বপ্নের এই চেইন বা ধারাবাহিকতা কোনো সাধারণ কিচ্ছা নয়, বরং বিশুদ্ধ হাদীসের আলোতে এটি একটি পরীক্ষিত, তাহকীককৃত এবং অলৌকিক মহাসত্য।
তবে এই মোবারক আমলটির মূল ভিত্তি কেবল স্বপ্নে নয়, বরং পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের সাধারণ ও অকাট্য নির্দেশেই নিহিত রয়েছে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর প্রতি দরূদ পাঠাও এবং সালাতু সালাম পেশ করো।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)।
স্বপ্নে প্রাপ্ত এই সত্যটি মূলত “মাওলিদ” বা “মিলাদ শরীফ” উদযাপনের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী এক অনুপ্রেরণার দলিল এবং একটি পরম বরকতময় আমল। স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মোবারক ইবারতে «مَوْلِدِ» (مৌলিদ বা মিলাদ) শব্দ উচ্চারণ করে নিজের পছন্দনীয় আমল হিসেবে একে পরম স্বীকৃতি দিয়েছেন। মহব্বত, আধ্যাত্মিকতা ও রূহানী মাকামের বিচারে এই ঘটনাটি অত্যন্ত শক্তিশালী।
এটি ছিল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে সরাসরি একটি রূহানী ফয়সালা বা সত্যায়ন সনদ। তিনি স্বয়ং রূহানীভাবে উপস্থিত হয়ে উনার পবিত্র মুখ মুবারক দিয়ে ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার «مَوْلِدِ» (মাওলিদ/মিলাদ) ও কাসীদাকে কবুল করে নিয়েছেন। এটি সাধারণ কোনো মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন নয়। আল্লাহর ওলী এবং আরিফগণের পরিভাষায়, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো খাছ ওলীকে স্বপ্নে কোনো দিকনির্দেশনা বা সুসংবাদ দেন, তখন তার হুকুম ও মর্যাদা সাধারণ স্বপ্নের মতো থাকে না। এটি সরাসরি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রূহানী উপস্থিতি, মোজেযা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অকাট্য সুসংবাদ (মুবাশশিরাত বা বশশারাত)। আউলিয়ায়ে কেরামের ইতিহাসে ৩টি স্বপ্নের এই ধারাবাহিক চেইন প্রমাণ করে যে— এটি কোনো কাল্পনিক কিচ্ছা নয়, বরং একটি পরীক্ষিত অলৌকিক মহাসত্য।


ইলমুত তা'বীর ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মানদণ্ডে তাহকীকী সিদ্ধান্ত
১. ধারাবাহিক স্বপ্নের সর্বোচ্চ স্তরের বিশ্বস্ততা ও কারামত:
ইসলামী শরীয়ত, ইলমুল হাদীস এবং ‘ইলমুত তা’বীর’ (স্বপ্নবিজ্ঞান)-এর অকাট্য মানদণ্ড অনুযায়ী—একই বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ৩ জন বিশ্বস্ত ও সালেহ (নেককার) ব্যক্তির ৩টি স্বপ্নের এই রূপ ধারাবাহিকতা আধ্যাত্মিক এবং শরয়ী ফয়সালায় সর্বোচ্চ স্তরের বিশ্বস্ততা ও প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
বাস্তবতার সাথে হুবহু মিল (কারামত): ২য় স্বপ্নে হযরত ইমাম আস-সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাত মোবারক থেকে শাহাদাতের যে পূর্বাভাস পেয়েছিলেন, তাতারীদের বাগদাদ আক্রমণের সময় উনার অন্ধত্ব সত্ত্বেও বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হওয়ার মাধ্যমে তা বাস্তবে হুবহু ফলে যায় [৯.৯.৯]। স্বপ্ন যদি সত্য না হতো, তবে এর জাগতিক ফলাফল বাস্তবে এভাবে মিলত না।
স্বপ্নের পারস্পরিক জোরদারকরণ (মুতাযাদিদ): একটি স্বপ্ন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, কিন্তু একই ব্যক্তি ও উনার "মাওলিদ" (মিলাদ) কবুল হওয়ার বিষয়ে ৩ জন ভিন্ন ভিন্ন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির স্বপ্ন পরস্পরের জন্য 'মুতাযাদিদ' (একে অপরের পরিপূরক ও শক্তিশালীকারী দলিল) হিসেবে কাজ করে। কোনো বুজুর্গের বুজুর্গি যখন সমসাময়িক অন্য কোনো সালেহ বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি স্বপ্নের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেন, তাকে "মুতাশাবিহাত ও شাহিদুল হাল" বা অকাট্য আত্মিক সাক্ষ্য বলা হয়। এটি প্রমাণ করে যে ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মিলাদ ও কাসীদা চর্চা কোনো লোকদেখানো বিষয় ছিল না, বরং তা নবীজী ﷺ উনার দরবারে সরাসরি মঞ্জুর হয়েছিল।
২. ঐতিহাসিক প্রাচীনত্ব ও বিদআত না হওয়ার অকাট্য প্রমাণ:
এই নীতি অনুযায়ী, হযরত ইমাম আস-সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি যে স্বপ্নটি দেখেছিলেন, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী তা শতভাগ সত্য এবং শয়তানের সর্বপ্রকার বিভ্রান্তিমুক্ত। এর দ্বারা এটিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয় যে, ৫৮৮ হিজরীতে মুসলিম সমাজে «مَوْلِدِكَ» (মাওলিদ/মিলাদ) মজলিস অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে বিদ্যমান ছিল এবং ইমাম সারসারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাওলিদ মজলিসে কাসীদা শরীফ রচনা ও পাঠ করতেন [৯.৯.৯]। এটি আরও প্রমাণ করে যে, হঠাৎ করে তখন এই মজলিস শুরু হয়নি, বরং তা ৫৮৮ হিজরীর বহু আগে থেকেই মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল [৯.৯.৯]। অতএব, অকাট্য তাহকীকী সিদ্ধান্ত হলো—«مَوْلِدِكَ» মজলিস করা কদাচ বিদআত নয়, बल्कि এটি সালাফে সালেহীনদের যুগ থেকে প্রচলিত একটি শরীয়তসম্মত বরকতময় আমল [৯.৯.৯]।
৩. রূহানী তত্ত্বাবধান ও জান্নাতী পুরস্কারের ঘোষণা:
এটিও স্পষ্ট ও মহাসত্য যে, মাওলিদ মজলিসে কাসীদা শরীফ পাঠ করার কারণেই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তিনি এই পরম সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এই মজলিসের কাসীদা পাঠ ও গুরুত্ব দিয়ে অংশগ্রহণ করাই উনার আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও বুজুর্গির অকাট্য প্রমাণ বহন করে। অতএব, «مَوْلِدِكَ» মজলিস ও দরূদ-সালামের মাহফিল স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কর্তৃক অনুমোদিত, উনার দরবারে অত্যন্ত সমাদৃত ও মকবুল এবং বৈধতা ও শ্রেষ্ঠত্বের একটি সুমহান আত্মিক দলিল।
ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু মিলে যাওয়া এবং স্বপ্নে শাহাদাতের সুসংবাদপ্রাপ্তি প্রমাণ করে যে—এই মোবারক মজলিসের সাথে আত্মিকভাবে সংযুক্ত থাকলে মুমিনের সম্পূর্ণ জীবনটিই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সরাসরি রূহানী তত্ত্বাবধান, দুআ মুবারক এবং সন্তুষ্টির চাদরে আবৃত থাকে, যার ফলশ্রুতিতে খালিক্ব মালিক্ব রব মহান আল্লাহ পাক তায়ালাও উনাকে কবুল করে নেন এবং জান্নাতী নিয়ামতে ধন্য করেন।