গান বাদ্য করা ও শুনা হারাম
পবিত্র কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে গান-বাজনা হারাম ও কবীরা গুনাহ। তা যে কোনো গানই হোক না কেন? যেমন নবীতত্ত্ব, মুর্শিদী, জারী, কাওয়ালী, পল্লীগীতি, ভাওয়ালী, ভক্তিমূলক ইত্যাদি। মহান খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ-
“মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা ‘লাহওয়াল হাদীছ’ খরীদ করে থাকে। উদ্দেশ্য হ”েছ ইলম ব্যতীত মানুষদেরকে মহান খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং সত্য পথের প্রতি বিদ্রƒপ করতে পারে। এ সকল লোকদের জন্য অপমানজনক শাস্তি রয়েছে।” (পবিত্র সূরা লুকমান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ-৬)
উল্লেখিত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ‘লাহওয়াল হাদীছ’ উনার ব্যাখ্যায় অনুসরণীয় সকল হযরত মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা গান-বাজনাকে সাব্যস্ত করেছেন।
(তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে আহকামুল কুরআন, তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে দুররে মানছুর, তাফসীরে মাদারিক, তাফসীরে মাআলিমুত তানযীল, তাফসীরে রূহুল মাআনী, তাফসীরে রুহুল বয়ান, তাফসীরে কবীর, তাফসীরে আবী সাউদ, তাফসীরে যাদুল মাসীর, তাফসীরে জালালাইন ইত্যাদি।)
একইভাবে অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে গান-বাজনা হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
استماع الملاهى معصية جلوس عليها فسق وتلذذ بها من الكفر
“গান শোনা গুনাহর কাজ, গানের মজলিসে বা আসরে বসা ফাসিকী এবং গানের সাধ গ্রহণ করা কুফরী।”
অন্য এক হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
الغناء ينبت النفاق فى القلب كما ينبت الماء الزرع
“পানি যেরূপ যমীনে ঘাস বা শস্য উৎপন্ন করে, তদ্রƒপ গান-বাজনা মানুষের অন্তরে মুনাফিকী পয়দা করে।”
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন,নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন
بعثت لكسر المزامير والاصنام
, “আমি বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করার জন্যে প্রেরিত হয়েছি।” (বায়হাক্বী শরীফ, দায়লামী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ, ফাতহুলবারী, উমদাতুল লুময়াত, শরইত তীব্রী, তালীকুছ ছাবীহ, মুযাহিরে হক্ব)
এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن حضرت نافع رضى الله تعالى عنه قال كنت مع ابن عمر رضى الله تعالى عنهما فى طريق فسمع مزمارا فوضع اصبعيه فى اذنيه وناعن الطريق الى الجانب الاخر ثم قال لى بعد ان بعد يا نافع رضى الله تعالى عنه هل تسمع شيئا قلت لا فرفع اصبعيه من اذنيه قال كنت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فسمع صوت يراع فصنع مثل ما صنعت قال نافع رضى الله تعالى عنه و كنت اذ ذاك صغيرا
অর্থ: হযরত না’ফে রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা কোন এক পথে আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমা উনার সাথে ছিলাম। এ সময় তিনি বাঁশীর সুর শুনতে পেলেন। তখনই তিনি নিজের দু অঙ্গুলী দু কান মুবারক উনার মধ্যে মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিলেন এবং সে রাস্তা হতে অপর রাস্তাদিয়ে সরে গেলেন। বহুদূর যাওয়ার পর আমাকে বললেন, হে নাফে’ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু! এখন কি আপনি কোন কিছু শুনতে পান? আমি বললাম, না। এবার তিনি উভয় কান মুবারক হতে অঙ্গুলী মুবারক সরিয়ে ফেললেন। অতঃপর বললেন, একবার আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ছিলাম, তখন তিনি (কোথাও হতে) বাঁশীর আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং আমি যা করেছি তিনিও তা করলেন। হযরত নাফে’ রদ্বিয়ল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বলেন, তখন আমি ছোট ছিলাম। (আহমদ ও আবূ দাঊদ শরীফ)
অর্থাৎ যে বাঁশীর সুর আমাদের প্রিয় নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঘৃণা করেছেন এবং যাকে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন, ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম উনাদের থেকে শুরু করে পরবর্তী সর্বযুগের ইমাম ও ফকীহ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা যাকে হারাম বলে ফতওয়া দিয়েছেন, তাকে চিত্ত-বিনোদনের নামে গ্রহণ করে নেয়ার কোন অবকাশ নেই। বরং তা সম্পূর্ণ হারাম।
কেউ কেউ বলে সুলতানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “গান-বাজনা” করেছেন। (নাঊযুবিল্লাহ) যারা এরূপ বলে তারা উনার উপর চরম মিথ্যা তোহমত দেয়। কারণ তিনি ছিলেন মহান আল্লাহ্ পাক উনার খাছ ওলী তথা “হাবীবুল্লাহ্”। যিনি সারা জীবন সুন্নতের পুরিপূর্ণ অনুসরন-অনুকরন করেছেন। উনার পےে কি করে হারাম “গান-বাজনা” করা সম্ভব? বিদয়াতীরা এ ব্যাপারে একটি দলীলও পেশ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ সুলতানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, হাবীবুল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “সামা” পাঠ করেছেন। আর বিদয়াতী, ভন্ড ফক্বীরেরা এটাকেই প্রচার করছে “গান-বাজনা” বলে। অথচ “গান-বাজনার” সাথে “সামা”-এর বিন্দুমাত্রও মিল নেই।
এ প্রসঙ্গে “ফাওয়ায়েদুল ফুওয়াদ” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, একদা দিল্লীর ৫০০ আলেমের সাথে সুলত্বানুল আউলিয়া হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বাহাছ হয়। কারণ দিল্লীর সেই আলিমরা অপবাদ দিয়েছিল যে, হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “গান-বাজনা” করেন। বাহাছে যখন এ প্রশ্ন উত্থাপন করা হলো- তখন হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি কস্মিনকালেও “গান-বাজনা” করিনা বরং আমি “সামা” করি। আর আমার “সামা” পাঠের শর্ত হ”েছ-
১) সেখানে কোন “বাদ্য-যন্ত্র” থাকবে না
২) কান বেগানা মহিলা থাকবে না
৩) কোন নাবালেগ দাড়ীবিহীন বালক থাকবে না,
(৪ যে ছন্দ বা ক্বাছীদাগুলো পাঠ করা হবে তা শরীয়ত সম্মত হতে হবে,
৫) তা মহান আল্লাহ্ পাক ও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের দিকে আকৃষ্টকারী হতে হবে,
৬) আর যাঁরা শুনবে, তাঁরা সবাই বুযুর্গ পরহেজগার ও আল্লাহ্ওয়ালা হতে হবে।
যখন হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একথা বললেন, তখন দিল্লীর আলিমরা উনাকে হক্ব বলে মেনে নিলেন এবং নিজদের ভুলের জন্য লজ্জিত হলেন। কাজেই পূর্ববর্তী আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা যে “সামা” পাঠ করেছেন তা এরূপই ছিল। সেই “সামা”র সাথে বর্তমান জারী বা কাওয়ালীকে তুলনা করা কূফরী বৈ কিছুই নয়। অতএব, প্রমাণিত হলো- সুলত্বানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, খাজা মুঈনুদ্দীন চীশতি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি জীবনে কখনোই “গান-বাজনা” করেননি। যারা উনার নামে মিথ্যা তোহমত দেয় তারা চরম ফাসেক ও কবীরা গুণাহে গুণাহ্গার।
কেউ কেউ বলে থাকে “বুখারী শরীফ”-উনার ৫ম খন্ড “গান-বাজনা” জায়িয লেখা আছে, তারা চরম জাহিল ও বিদয়াতী। আর জাহিল বলেই বুখারী শরীফ-উনার ৫ম খন্ড দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে। অথচ মূল বুখারী শরীফ-উনার কোন ৫ম খন্ডই নেই। যারা বুখারী শরীফ-উনার ৫ম খন্ডে “গান-বাজনা” জায়িয লেখা আছে বলে থাকে তারা যেন- বুখারী শরীফ-উনার যেখানে “গান-বাজনা” জায়েয বলা হয়েছে সে অংশটুকু বাংলায় অনুবাদ করে দেয়। তবেই তার মিথ্যা দলীলের হাক্বীক্বত প্রকাশ পেয়ে যাবে। মূলতঃ বুখারী শরীফ-উনার কোথাও যদি “গান-বাজনা” জায়িয লেখা থাকতো তবে ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার “আদাবুল মুফরাদ” কিতাবে “গান-বাজনা” হারাম বললেন কেন? কাজেই যারা এ ব্যাপারে বুখারী শরীফ-উনার দলীল দেয় তারা চরম জাহিল, ভন্ড, বিদয়াতী ও প্রতারক।
মূলকথা হ”েছ ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ অনুষ্ঠানসহ সকল ¯’ানেই “গান-বাজনা” করা হারাম। এটাকে হালাল বলা কুফরী। সুলতানুল হিন্দ গরীবে নেওয়াজ হাবীবুল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি জীবনে কখনো “গান-বাজনা” করেননি। আর শুধু বুখারী শরীফ নয় বরং কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ-এর কোথাও “গান-বাজনা” জায়িয বলা হয়নি।
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের আলোকে অনুসরণীয় হযরত ইমাম মুজতাহিদ তথা ফুক্বাহায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ফতওয়া প্রদান করেছেন যে, গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণ রূপে হারাম। এটাকে হালাল বলা কুফরী। (ফতওয়ায়ে আলমগীরী, খুলাছাতুল ফতওয়া, জামিউল ফতওয়া, মুহীত-মুগনী, হিদায়া, তাতারখানিয়া, ফতহুল ক্বাদীর, ফতওয়ায়ে আযীযী ইত্যাদি।)