আমাকে যদি কেউ জুলাই অভ্যুত্থাণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকাকে একবাক্যে প্রকাশ করতে বলে; আমি বলব, জেনারেল ওয়াকার একজন গেইম চেঞ্জার। তার একটা পদক্ষেপে ইতিহাসের প্রবাহ ইউটার্ন করেছিল।

আমি মনগড়া থিওরি বিল্ড আপ করছি না। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে হয় প্রতিটি পক্ষের বক্তব্য দেখে। আমার কথার প্রমাণ পেতে আওয়ামী লীগের কথাগুলো শুনুন।

লীগের মূল ক্ষোভ বিএনপির ওপরে না। এনসিপির ওপরেও না। ইউনুসের ওপরেও না। এদের মূল ক্ষোভ ওয়াকারের ওপর। লীগের ক্ষোভ ওয়াকার কেন সেদিন ঘুরে গিয়েছিল। কেন গুলি না চালিয়ে হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কেন সেদিন অস্ত্রধারী লীগের দিকে বন্দুক তাক করেছিল সেনাবাহিনী।

এজন্য লীগাররা ওয়াকারকে মির জাফর বলে। তারেক রহমান সহ পুরো বিএনপি, এনসিপি ধর্মীয় বক্তব্য দিলেও লীগের এতটা জ্বলে না; যতটা জ্বলে ওয়াকারের মুখে দাড়ি, খলিফাদের নামে ব্যাটালিয়ন, ইসলামিক ইনস্টিটিউট আর ধর্মীয় বক্তব্য শুনে।

সামরিক বাহিনী সেদিন জনগণের পক্ষে না দাঁড়ালে দেশটা মিয়ানমারের মতো গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত। হাসিনার চূড়ান্ত পতন হয়েছে সামরিক বাহিনীর হাতে।

যারা এটা মানতে চায় না তারা হয় রাজনীতি, অভ্যুত্থাণ, বিপ্লব কি ও কিভাবে হয় সেটা বোঝে না। অথবা তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্লকের এজেন্ট হয়ে চাপার জোরে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে।

'জনগণ ক্যান্টনম্যান্টগুলো দখল করে নিতো' কথাটা অসম্ভব না হলেও সহজ না। রক্তের স্রোত বয়ে যেত। আই রিপিট রক্তের স্রোত বয়ে যেত। একটা প্রশিক্ষিত বাহিনীর সাথে নিরস্ত্র মানুষ লড়াই করতে পারে না।

পাশের দেশ মিয়ানমারের দিকে তাকান। এখনো গৃহযুদ্ধ চলছে। সামনে পশ্চিমাদের নির্দেশে যুদ্ধ বাড়বে।

পাকিস্তানের ইমরান খানের দিকে তাকান। জনপ্রিয় বৈধ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলো সামরিক হস্তক্ষেপে।

তুরস্কে সেনাদের একাংশের বিদ্রোহে একরাতে নিহত হয় ৪৫০+ মানুষ। পরে বাহিনী ভেতর থেকেই নিজেদের বিদ্রোহ দমন করে।

রাশিয়ার সমাজ বিপ্লবের দিকে তাকান। রুশ সামরিক বাহিনী জারের পক্ষ ত্যাগ করে শ্রমিক-কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।

ফরাসী বিপ্লবের দিকে তাকান। ফরাসি রাজকীয় বাহিনী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েছিল। রাজতন্ত্র উৎখাতের পরবর্তী শাসক নেপোলিয়ন নিজেই তো সামরিক অফিসার ছিল।

সামরিক বাহিনী চেইন অব কমান্ডে চলে৷ তাদের প্রশিক্ষণ তাদেরকে হার্টলেস ও রোবাস্ট করে তোলে। কমান্ড পাওয়ার সাথে তারা কারো বুকে গুলি চালাতে দ্বিতীয়বার ভাবে না। শিশু, বৃদ্ধ, নারী; এমনকি নিজের রক্তের কাউকে মারার কমান্ড আসলে সেটাও তারা পালন করবে।

অর্থাৎ সেদিন সামরিক বাহিনী লাখ লাখ মানুষ হত্যার কমান্ড পেলে সেটাই করত। লাস্ট বুলেট থাকা পর্যন্ত লড়াই করবে, সব সদস্য মরবে; তবুও নিজেদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যাবে না।

এখানে আমি সামরিক বাহিনীকে একক কৃতিত্ব দিচ্ছি না। আমি বলছি দেশটা তারা গৃহযুদ্ধের হাত থেকে তারা রক্ষা করেছে। জামাত, এনসিপি, ইউনুস মিলে বাংলাদেশকে মার্কিন বলয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও সামরিক বাহিনী নস্যাৎ করেছিল। (তবে সেই ঝুঁকি এখনো আছে।)।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এতদিন তবে হাসিনাকে তারা উৎখাত করেনি কেন? কারণ:

(১) সামরিক অভ্যুত্থানকে পৃথিবীতে ভালো চোখে দেখা হয় না।

(২) সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রপ্রধান নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের মোটিভ—স্বাধীনতা, অক্ষুণ্ণ মানচিত্র ও বাধাহীন প্রশিক্ষণ।

(৩) জনগণ কাউকে না চাইলে সামরিক বাহিনী তাকে সরিয়ে দেবে। জনগণ চুপচাপ ঘরে বসে থাকার মানে, জনগণ শাসকের সাথে এডজাস্ট করে নিয়েছে।

যদি সেদিন জেনারেল ওয়াকার সামরিক শাসন জারি করত, তবে কারো কিছু করার ছিল না। কারণ, জনগণের ক্ষোভ ছিল হাসিনার ওপর। হ্যাঁ, তখনও গৃহযুদ্ধ না হলেও সহিংস আন্দোলনের সম্ভাবনা ছিল। মার্কিন ও ভারতীয় হস্তক্ষেপ হতো। কৌশলে ইউনুসকে দিয়েই ইউনুসের জানাজা পড়িয়েছেন জেনারেল ওয়াকার। নিজে ক্ষমতায় না বসে স্বাভাবিক একটা সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন।

যদিও এ সব প্রচেষ্টাই ক্ষনস্থায়ী। কারণ, এখন আমেরিকা ও ভারত বিএনপিকে মাইনাস করার চেষ্টা করছে। ফখরুল, জাহেদের মতো শাহবাগী মার্কা লোকদের দিয়ে পুরনো ধারার রাজনীতি রাখলে বিএনপির পতনও অনিবার্য। আর বিএনপির পতন হলে রাষ্ট্র পরিচালনা করার আর কোনো পক্ষ থাকবে না।

তাই আগেও বলেছি এখনো বলছি, ঘুরে-ফিরে ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতেই যাবে একসময়। যা ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ঘটার কথা ছিল, তা কয়েকটা বছর পর ঘটবে।
লেখা সংগ্রহ