হীলাহ্ বিবাহ এবং তার শরয়ী ফায়সালা (২)
মহান আল্লাহ পাক তিনি অন্যত্র ইরশাদ মুবারক করেন-
كَذَٰلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ
অর্থ: এমনিভাবে আমি হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনার জন্য হীলাহ্ বা হিকমত অবলম্বন করেছি (উনার ভাইকে আবদ্ধ করে রাখার জন্য) (সূরা ইউসূফ শরীফ -৭৬)
আলোচ্য আয়াত শরীফে ‘কাইদ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, হীলাহ্ বা কৌশল। হযরত ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, এর দ্বারা হীলাহ এর বৈধতা প্রমাণিত। আর তার দ্বারা স্বীয় হুকুক বা অধিকার হাসিলের জন্য হীলাহ্ অবলম্বন করার বৈধতা প্রতিয়মান হয়। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনার কাজের উপর সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই তিনি তা স্বীয় জাত পাকের প্রতি নিসবত বা সম্পৃক্ত করে ইরশাদ মুবারক করেন- আমিই হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালাম উনাকে হীলাহ্ বা হিকমত করার শিক্ষা দিয়েছি। (আহকামুল কুরআন শরীফ-৩/২৫৮)
তাফসীরে মা’রিফুল কুরআন, ৫/১১৭ পৃৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, এই আয়াত শরীফে পরিস্কার ভাবে মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই হীলাহ্ বা হিকমত করাকে স্বীয় জাত পাকের প্রতি এ মর্মে নিসবত করেছেন যে, এসব কাজ মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ মুবারকে হয়েছে। বিধায় একে অবৈধ বলার কোন সুযোগ নেই। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عن حضرت أبي هريرة رضي الله عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم استعمل رجلا على خيبر ، فجاءه بتمر جنيب ، فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم " أكل تمر خيبر هكذا ؟ " فقال لا ، والله يا رسول الله صلي الله عليه وسلم إنا لنأخذ الصاع من هذا بالصاعين . والصاعين بالثلاثة . فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " لا تفعل . بع الجمع بالدراهم . ثم ابتع بالدراهم جنيبا.
অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রাহ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একজন ছাহাবী (হযরত সাওয়াদ ইবনে গাজিয়াহ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু) উনাকে খায়বরের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। উক্ত হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি একদিন কিছু উন্নতমানের খেজুর নিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক খিদমতে হাজির হলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, খাইবরের সকল খেজুরই কি এরকম উন্নতমানের? তিনি বললেন, জি না, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা এ ধরনের এক সা’ খেজুর নিম্নমানের দুই সা’ খেজুরের বিনিময়ে এবং দুই সা’ খেজুর নিম্নমানের তিন সা’ খেজুরের বিনিময়ে কিনে থাকি। তখন নূরে মুুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আপনারা এরূপ করবেন না। বরং নিম্নমানের খেজুরকে প্রথমে দিরহামের পরিবর্তে বিক্রি করবেন। তারপর ঐ দিরহাম দিয়ে উন্নতমানের খেজুর কিনবেন। অর্থাৎ হীলাহ্ বা কৌশল- হিকমত করবেন। (বুখারী শরীফ -২১৮০, মুসলিম শরীফ-১৫৯৩)
অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে- একদিন সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি উন্নতমানের এক প্রকার খেজুর নিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র দরবার শরীফে উপস্থিত হলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এগুলো কোথা থেকে এনেছেন? সাইয়্যিদুনা হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বললেন, আমার নিকট নিম্ন মানের কিছু খেজুর ছিল। সেগুলো দুই সা’ দিয়ে আপনার জন্য এই এক সা’ খেজুর ক্রয় করেছি। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, এটা প্রকৃতপক্ষে সুদ। আর কখনো এরকম করবেন না। তবে যদি কখনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে নিম্ন মানের খেজুরকে প্রথমে দিরহাম দিয়ে বিক্রি করবেন। অতঃপর সেই দিরহাম দিয়ে এগুলো কিনে নিবেন। অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং নিজেই হীলাহ বা হিকমত করার তারতীব শিক্ষা দিলেন। সুবহানাল্লাহ্! (বুখারী শরীফ- ২১৮৮, মুসলিম শরীফ- ১৫৯৪)
উল্লেখ্য যে, হীলাহ্ বা কৌশল সম্মানিত শরীয়ত উনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা মানব জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব প্রয়োজনীয়। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম, হযরত তাবেয়ীনে ইজাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত তাবে তাবেয়ীনে ইজাম ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা সবাই প্রয়োজনে হীলাহ্ বা কৌশল করেছেন। আর হীলাহ্ বা কৌশল করার পন্থা -পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন।
একদিন এক ব্যক্তি সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আযম আলাইহিস সালাম উনার নিকট হাজির হলেন। আরজ করলেন, ইয়া আমীরুল মু’মিনীন! আমি এই শর্তে আমার আহলিয়াকে (স্ত্রী) তিন তালাক দিয়েছি যে, যদি আমি আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলি, তাহলে আমার আহলিয়া তিন তালাক প্রাপ্তা হবেন। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি আপনার আহলিয়াকে এক তালাকে বাইন দিয়ে ইদ্দত অতিবাহিত করতে দিন। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর আপন ভাইয়ের সাথে কথা বলুন। অতঃপর ঐ তালাক প্রাপ্তা আহলিয়াকে পুনরায় বিবাহ করুন। তাতে আহলিয়ার (স্ত্রী) উপর তিন তালাক পতিত হওয়া ব্যতিত ভাইয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ হবে। (মাবসূত লিছ সারাখসী-৩০/১৯৮)
আল্লামা ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করা বৈধতার উপর হাদীছ শরীফ দ্বারা বিভিন্ন দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। অতঃপর বলেছেন, এসব বিষয়সমূহের বৈধতা পাওয়ার জন্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হীলাহ্ বা কৌশল করার নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন। যদি তাতে হীলাহ্ গ্রহণ করা না হত তাহলে তা নিষিদ্ধ ও হারাম হয়ে যেত।
মহান আল্লাহ পাক তিনি অবৈধভাবে নিরিবিলি অবস্থানকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। তবে তা হালাল বা বৈধ হওয়ার জন্য বিবাহের নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন। অন্যায়ভাবে কারো মাল-সম্পদ দখল করতে নিষেধ করেছেন। তবে ব্যবসা- বাণিজ্য, হাদীয়া-তোহফা লেনদেনের মাধ্যমে তা হালাল বা বৈধ করেছেন। কাজেই, যারা হালাল বা বৈধ বিষয়ে পৌঁছার জন্য সম্মানিত শরীয়তসম্মত হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করাকে অস্বীকার করে প্রকৃতপক্ষে তারা শরীয়াহ কর্তৃক প্রমাণিত হুকুম বা বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে। নাউযুবিল্লাহ! (আহকামুল কুরআন শরীফ - ৩/১৭৬)
আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যদি হালাল ও গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য হীলাহ্ বা হিকমত করা হয় তা ভালো। আর যদি কোন মুসলমানের হক নষ্ট করার নিয়তে হীলাহ্ করা হয় তাহলে তা গুনাহ্ ও অন্যায়। (ফাতহুল বারী- ১৫/৪০৪)
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, মাকরুহ ও হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং গুনাহ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে হীলাহ্ বা কৌশল করা শুধু বৈধই নয় বরং মুস্তাহাব। কিন্তু কোন মুসলমানের হক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে হীলাহ্ করা গুনাহ্ ও অন্যায়।
ইমাম মুহম্মদ ইবনুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হক বিনষ্টকারী বাতিল হীলাহ্ বা কৌশলের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার বিধান থেকে পলায়ন করা কোন মু’মিনের কাজ নয়।
ইমাম সারাখসী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যে হীলাহ্ বা উপায়ে মানুষ হারাম ও নাজায়িয থেকে বিরত থাকতে পারে অথবা হালাল কাজে উপনীত হতে পারে, তা বৈধ ও ভালো। তবে যে হীলাহ্ বা কৌশলের দ্বারা অপরের হক নষ্ট হয় কিংবা সত্যের মধ্যে সংশয় বা সন্দেহ সৃষ্টি হয় অথবা বাতিলকে হক বা সত্য বানিয়ে পেশ করা হয় তাহলে এ ধরনের হীলাহ্ নাজায়িয ও মাকরুহ। পক্ষান্তরে যে হীলাহ্ বা কৌশল সে রকম নয় তাতে কোন দোষ নেই। (মাবসূত লিস সারাখসী- ৩০/২১১)
ইকদুস সুনান ২৮/৪২৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, হীলাহ্ হচ্ছে , একটি অবৈধ পদ্ধতিকে পরিত্যাগ করে বৈধ পদ্ধতি প্রহণ করা। আর বৈধ হীলাহ্ বা কৌশল অবলম্বন করার মধ্যে কোন অনিষ্টতা নেই। সম্মানিত শরীয়ত কিংবা যৌক্তিক ভাবেও তাতে ঘৃণার কোন উপাদান নেই। তবে যদি বিশেষ কোন হীলাহ্ বা কৌশলের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদের কোন উপাদান পাওয়া যায় তাহলে তা নাজায়িজ ও হারাম।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, যেসব বৈধ হীলাহ্ দ্বারা হারাম থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং হালালকে অবলম্বন করা যায় তা ভালো ও পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে যে সব হীলাহ্ বা কৌশল দ্বারা কারো হক নষ্ট করা হয় কিংবা অসত্যকে সত্য বানিয়ে উপস্থাপন করা হয় অথবা হক বা সত্যকে সংশয় ও সন্দেহযুক্ত করা হয় তা অবৈধ ও অপছন্দনীয়।