সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, রহমাতুল্লিল আলামীন, ক্বয়িদুল মুরসালীন, রউফুর রহীম, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত মহাপবিত্র জীবনী মুবারক (২৩১৩)
, ২৬ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৫ ছানী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৫ মে, ২০২৬ খ্রি:, ০১ জৈষ্ঠ্য, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) বরকতময় জিবনী মুবারক

কাট্রা কাফির আবূ রাফে’ অর্থাৎ সালাম ইবনে হাকীকের হত্যা:



এই কাফিলার সকলেই ছিলেন খাযরাজ গোত্রের শাখা বনু সালামাহ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। উনাদের সেনাপতি ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ বিন আতীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। উনারা সরাসরি খায়বার অভিমুখে গেলেন। কারণ কাট্টা কাফির আবূ রাফি’র দূর্গটি তথায় অবস্থিত ছিলো। যখন উনারা দূর্গের নিকটে গিয়ে পৌঁছলেন তখন সূর্য অস্তমিত হচ্ছিলো। সেখানকার লোকজনেরা তাদের গবাদি পশুর পাল নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিলো। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আতীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার সাথীদের বললেন, ‘আপনারা এখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। আমি দরজার প্রহরীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে এমন হিকমত অবলম্বন করবো যার ফলে অবশ্যই ভিতরে প্রবেশ করা সহজ ও সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ!

এরপর তিনি দূর্গের দরজার নিকট গেলেন এবং মাথায় ঘোমটা টেনে এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করলেন যাতে দেখলে মনে হয় যে, কেউ যেন হাজত পূরণ করার জন্য বসে আছেন। প্রহরী সে সময় চিৎকার করে ডাক দিয়ে বললো, ‘ওহে আল্লাহ পাক উনার বান্দা! যদি ভিতরে আসার প্রয়োজন থাকে তবে এক্ষুনি চলে আসুন নচেৎ আমি দরজা বন্ধ করে দিবো।’

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আতীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, ‘আমি এই সুযোগে দূর্গের ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং নিজেকে গোপন করে রাখলাম। যখন লোকজন সব ভিতরে এসে গেলো, প্রহরী তখন দরজা বন্ধ করে দিয়ে চাবির গোছাটি একটি খুঁটির উপর ঝুলিয়ে রাখলো। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর যখন লক্ষ্য করলাম যে, সমগ্র পরিবেশ নিশ্চুপ ও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে তখন আমি চাবির গোছাটি হাতে নিয়ে দরজা খুলে দিলাম এবং আমার সাথী যারা ছিলেন উনাদেরকে যথাস্থানে অবস্থান করতে বললাম। আমরা পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী সামনে চললাম।

কাট্টা কাফির আবূ রাফি’ উপর তলায় অবস্থান করছিলো। সেখানেই তার নোংড়া পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। বৈঠক শেষে বৈঠককারীরা যখন নিজ নিজ স্থানে চলে গেলো তখন আমি উপর তলায় উঠে গেলাম। আমি যে দরজা খুলতাম ভিতর থেকে তা বন্ধ করে দিতাম। আমি এটা স্থির করে নিলাম যে, যদি লোকজনেরা আমার প্রবেশ সম্পর্কে অবহিত হয়েও যায়, তবুও আমার নিকট তাদের পৌঁছবার পূর্বেই যেন কাট্টা কাফির আবূ রাফি’কে হত্যা করতে পারি। এভাবে আমি তার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম।

কিন্তু সে তার পরিবার পরিজন এবং সন্তানাদি পরিবেষ্টিত অবস্থায় এক অন্ধকার কক্ষে অবস্থান করছিলো। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে, সে কক্ষের ঠিক কোন স্থানে অবস্থান করছে। এ কারণে আমি তার নাম ধরে ডাক দিলাম, ‘আবূ রাফি’।’ সে জবাব দিলো, ‘কে ডাকছেন?’ তৎক্ষণাৎ আমি তার কণ্ঠস্বরকে অনুসরণ করে দ্রুত অগ্রসর হলাম এবং তরবারি দ্বারা জোরে তার দিকে আঘাত করলাম। কিন্তু আমার এ আঘাতে কোন ফল হলো না বলে মনে হলো। এদিকে সে জোরে চিৎকার করে উঠলো।

কাজেই, আমি দ্রুতবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম এবং অল্প দূরে এসে থেমে গেলাম। অতঃপর কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে আবার ডাক দিলাম, ‘আবূ রাফি! এ কণ্ঠস্বর কেমন?’ সে বললো, ‘তোমার মা ধ্বংস হোক! অল্পক্ষণ পূর্বে এ ঘরেই কে আমাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করেছে?’ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আতীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, ‘আমি আবার প্রচন্ড শক্তিতে তরবারী দ্বারা তাকে পূনরায় আঘাত করলাম। এই আঘাতে তার ক্ষতস্থান থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটতে থাকলো। কিন্তু এতেও তাকে হত্যা করা সম্ভব হলো না।

তখন আমি তরবারীর অগ্রভাগ সজোরে তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করে দিলাম। তরবারীর অগ্রভাগ তার পৃষ্ঠদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। এখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, সে নিহত হয়েছে। তাই আমি একের পর এক দরজা খুলতে খুলতে নীচে নামতে থাকলাম। অতঃপর সিঁড়ির মুখে শেষ ধাপে গিয়ে বুঝতে পারলাম যে, আমি মাটিতে পৌঁছে গিয়েছি। কিন্তু নিচের সিঁড়ির মাটিতে পা রাখতে গিয়ে আমি নীচে পড়ে গেলাম।

চাঁদের আলোয় আলোকিত ছিলো চার দিক। নীচে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গোড়ালিতে আঘাতপ্রাপ্ত হলাম। মাথার পাগড়ী মুবারক খুলে শক্ত করে বেঁধে ফেললাম আমার পায়ের গোড়ালি। অতঃপর দরজা হতে দূরে গিয়ে বসে পড়লাম এবং মনে মনে স্থির করলাম যে, যতক্ষণ না ঘোষণাকারীর মুখ থেকে তার মৃত্যুর ঘোষণা শুনতে পাচ্ছি ততক্ষণ আমি এ স্থান ত্যাগ করবো না। মোরগের ডাক শুনে বুঝতে পারলাম, রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় দূর্গ শীর্ষ থেকে ঘোষণাকারী ঘোষণা করলো যে, ‘আমি হিজাজের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবূ রাফি’র মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করছি।

-আল্লামা সাইয়্যিদ শাবীব আহমদ।