ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উনার ফযীলত মুবারক

Comments · 498 Views

ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উনার ফযীলত মুবারক

ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উনার ফযীলত মুবারক

লেখক:- সাইয়্যিদ মুহম্মদ ছোয়াদ

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

اِقْرَاْ بِاِسْمِ رَبِّكَ الَّذِى خَلَقَ.

অর্থ:- আপনার মহান রব তায়ালা যিনি সৃষ্টি করেছেন উনার নাম মুবারক স্মরণ করে পাঠ করুন। (পবিত্র সুরা আলাক্ব শরীফ ; পবিত্র আয়াত শরীফ নং ১)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন,

قُلْ رَبِّ زِدْنِى عِلْمًا.

অর্থ:- হে রসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি বলুন, হে আমার সম্মানিত রব! আমার ইলম বৃদ্ধি করে দিন। (পবিত্র সুরা ত্ব-হা শরীফ ; পবিত্র আয়াত শরীফ নং ১১৪)

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ خَرَجَ فِىْ طَلَبِ العِلْمِ فَهُوَ فِىْ سَبِيْلِ اللّٰهِ حَتّٰى يَرْجِعُ - رَوَاهُ التِّرْمِذِىُّ وَ الدَّارِمِىُّ.

অর্থ:- হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে বাক্তি ইলম অর্জনের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হবে; সে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় থাকবে। সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র তিরমিযী শরীফ ও দারেমী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ تَدَارُسُ الْعِلْمِ سَاعَةً مِنَ اللَّيْلِ خَيْرٌ مِنْ احْيَائِهَا - رَوَاهٗ الدَّارَمِىّ

অর্থ:- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের কিছু সময় দ্বীনি ইলম চর্চা করা সারা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করা হতে উত্তম। সুবহানাল্লাহ! (দারেমী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عَنِ الْحَسَنِ رَحْمَةُ اللّٰهِ عَلَيْهِ قَالَ الْعِلْمُ عِلْمَانِ فَعِلْمٌ فِىْ الْقَلْبِ فَذَاكَ الْعِلْمُ النَّافِعُ وَ عِلْمٌ عَلٰى اللِّسَانِ فَذَاكَ حُجَّةُ اللّٰهِ عَزَّ وَ جَلَّ عَلٰى اِبْنِ اَدَمَ - رَوَاهٗ الدَّارَمِى

অর্থ:- হযরত হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইলম দুই প্রকার। ১. এক প্রকার ইলম হচ্ছে অন্তরে; এটা হলো উপকারী ইলম। আর ২. দ্বিতীয় প্রকার ইলম হচ্ছে মুখে। এটা বনী আদমের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার দলীল। সুবহানাল্লাহ! (দারেমী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে,

وَ عَنْ اَنَسٍ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلّٰى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ خَرَجَ فِىْ طَلَبِ الْعِلْمِ فَهُوَ فِي سَبِيْلِ اللّٰهِ حَتّٰى يَرْجِعَ رَوَاهٗ التِّرْمِذِىّ وَالدَّارَمِىّ.

অর্থ:- হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হাবাবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি ইলম অনুসন্ধানে বের হয়েছে, সে মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় রয়েছে, যে পর্যন্ত না সে প্রত্যাবর্তন করবে। সুবহানাল্লাহ! (তিরমিযী শরীফ ও দারেমী শরীফ)

তিনি ইলম অর্জনের ফযীলত সম্পর্কে আরো ইরশাদ মুবারক করেন,

وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ تُدَارِسُ الْعِلْم سَاعَةَ مِنَ الْلَيْلِ خَيْرُ مِنْ اَحْيَائِهَا رَوَاهٗ الدَّارَمِىّ.

অর্থ:- হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাত্রের এক মূহুর্ত ইলমের আলোচনা করা পূর্ণরাত্র জাগ্রত থাকা (ও ইবাদতে ব্যয় করা) অপেক্ষা উত্তম। সুবহানাল্লাহ! (দারেমী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো উল্লেখ করা হয়,

وَعَنِ الْحَسَنِ رَحْمَةُ اللّٰهِ عَلَيْهِ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلّٰى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ جَاءَهٗ الْمَوْتُ وَهُوَ يَطْلُبُ الْعِلْمَ لِيُحْبِىْ بِهٖ الْإَسْلَامِ فَبَيِّنِهٖ وَبَيْنَ النَّبِيِّيْنَ دَرْجَةً وَاحِدَةً فِىْ الْجَنَّةِ (رَوَاهٗ الدَّارَمِى مُرْسَلًا)

অর্থঃ- হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হতে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তির ইলম অর্জন করা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে এবং তার ইলম অর্জন করার উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত দ্বীন ইসলাম উনাকে জিন্দা করা, বেহেস্তে তার মধ্যে ও হযরত নবী রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্যে মাত্র একটি দরজা পার্থক্য থাকবে। অর্থাৎ তাকে নুবুওয়াত মুবারক ছাড়া সকল মর্যাদাই দেয়া হবে। সুবহানাল্লাহ! (দারিমী ইহাকে মুরসাল হিসাবে বর্ণনা করেন)

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন,

َعَنْ اَبِى هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلّٰى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَ مَاتَ الْاِنْسَانُ اِنْقَطَحَ عَنْهُ عَمَلَهٗ الْاٰمِن اِلَّا الْاٰمَنُ صِّدْقَةِ جَارِيَهٗ اَوْ عِلْمُ يُنْتِفُعُ بِهٖ اَوْ وَلَدُ صَالِح يَدْعُوْ لَهٗ. (رَوَاهٗ مُسْلِم)

অর্থ: হযরত আবু হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মানুষ যখন মরে যায়, তখন তিনটি আমল ব্যতীত সকল আমলের সাওয়াব বন্ধ হয়ে যায়- (১) সদকায়ে জারিয়া (অর্থাৎ মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, পুল ইত্যাদি), (২) ইলম, যার দ্বারা লোকের উপকার সাধিত হয়, (৩) সৎ সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। সুবহানাল্লাহ! (মুসলিম শরীফ)

হযরত ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

مَنْ تَفَقَّهٗ وَ لَمْ يَتَسْوَفَ فَقَدْ تَفَسَّقْ وَ مَنْ تَسَوَفَ وَ لَمْ يَتَفَقَّه فَقَدْ تَزَنْدَق وَ مَنْ جَمَعَ بَيْنَهُمَا فَقَدْ تَحَقَّق.

অর্থঃ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করল কিন্তু ইলমে তাসাউফ অর্জন করল না সে ব্যক্তি ফাসিক। এবং যে ব্যক্তি শুধুমাত্র ইলমে তাসাউফ অর্জন করল কিন্তু ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করল না সে ব্যক্তি যিন্দিক (কাফির) এবং যে ব্যক্তি উভয় ইলম অর্জন করল সে ব্যক্তিই মুহাক্কীক।

হযরত ফখরুদ্দীন রাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইলমে মানত্বেক বিষয় একখানা ওয়াকেয়া মুবারক রয়েছে,

হক্কানী শায়েখ উনার উসীলায় ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ।

মানতিকের ইমাম হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাদরাসায় লেখাপড়া শেষ করেছেন। তিনি কিতাবে পড়েছেন, ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উভয় প্রকার ইলমই অর্জন করতে হবে। প্রত্যেকের জন্য সেটা ফরয। তিনি তো ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করেছেন মাদরাসায় গিয়ে। কিন্তু তখন পর্যন্ত উনার ইলমে তাসাউফ অর্জন করা হয়নি। তাই তিনি ইলমে তাসাউফ অর্জন করার জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ গেলেন। গিয়ে বললেন, হুযূর! আমি আপনার কাছে বাইয়াত হতে এসেছি।

হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম কি? তিনি বললেন, আমার নাম ফখরুদ্দীন। হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, কোন ফখরুদ্দীন? যিনি মানতিকের ইমাম? তিনি জবাব দিলেন, জী হুযূর! আমি সেই ফখরুদ্দীন। হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বাইয়াত করালেন। অতঃপর সবক্ব দিয়ে বললেন, আপনার ভিতর মানতিকের ইলম পরিপূর্ণ। কাজেই, আপনি আগামী এক বছর যাহিরী কোনো পড়া-শুনা না করে নিরিবিলি অবস্থান করে ইলমে তাসাউফ বা তরীক্বতের সবক আদায় করতে থাকেন। শায়েখ উনার নির্দেশ মুতাবিক তিনি নিরিবিলি অবস্থান করে তরীক্বতের সবক্ব আদায় করতে লাগলেন।

এরপর তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন শায়েখ তো পড়তে নিষেধ করেছেন। কিন্তু লিখতে তো নিষেধ করেননি। এ চিন্তা করে তিনি তরীক্বতের সবক্ব আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তাফসীর লিখতে শুরু করলেন এবং বেশকিছু অংশের তাফসীর লিখলেন। যা তাফসীরে কবীর হিসেবে আজ সারাবিশ্বে মশহূর। বছর শেষে তিনি যখন উনার শায়েখ হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফে উপস্থিত হলেন; শায়েখ উনাকে দেখেই বললেন, আপনার তো ইলমে মানতিক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বললেন, আপনার ভিতরে ইলমে তাসাউফ প্রবেশ করাতে হলে ইলমে মানতিক কমাতে হবে। এটা বলে তিনি ইলমে মানতিক কমানোর জন্য ফায়িয নিক্ষেপ করলেন। এতে হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার ভিতরে করকর শব্দ হতে লাগলো। তিনি শায়েখ উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুযূর! আমার ভিতরে কিসের শব্দ হচ্ছে। শায়েখ বললেন, আপনার ভিতরে মানতিকের যে অতিরিক্ত ইলম আছে, সেটা কমিয়ে দিচ্ছি। তিনি বললেন, হুযূর! বেয়াদবি মাফ করবেন, ফখরুদ্দীনের ফখরই তো ইলমে মানতিক। এটা না কমানোর জন্য তিনি আরজু পেশ করলেন এবং শায়েখ উনার সবক্ব নিয়ে নিজের এলাকায় চলে আসলেন। শায়েখ উনার ইজাযত নিয়ে তিনি স্বীয় এলাকায় তালীম-তালক্বীন, দর্স-তাদরীসের কাজ করতে লাগলেন। তিনি জানেন শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সাধারণ মুসলমান তো বটে, যারা আলিম-উলামা, পীর-মাশায়িখ, ছুফী-দরবেশ দাবীদার তাদেরকেও শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং অনেককে বিভ্রান্ত করেও ফেলে। এমনকি ইন্তিকালের মুহূর্তেও শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করার চেষ্টা করে থাকে। সেজন্য মানতিকের ইমাম হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুখতালিফ রিওয়ায়েত মুতাবিক একশ থেকে এক হাজার দলীল প্রস্তুত করে রাখলেন যাতে ইন্তিকালের সময় উনাকে শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করতে না পারে।

উনার অন্তিম সময়ে শয়তান যথারীতি উপস্থিত হলো। সে এসে দাবি করলো মহান আল্লাহ পাক তিনি একক নন। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সে কথা অস্বীকার করলেন। উভয়ের মধ্যে বাহাস শুরু হলো। ইবলীসের বাতিল যুক্তি খন্ডন করে হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দলীল পেশ করতে লাগলেন।

শয়তান একসময় ছিল সমস্ত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের শিক্ষক। অন্যদিকে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করলেও, ইলমে তাসাউফ (অন্তর পরিশুদ্ধকারী ইলম) পরিপূর্ণভাবে হাছিল করেননি। ফলে তিনি যতই দলীল পেশ করতে লাগলেন, শয়তান তার সবই খন্ডন করে ফেলতে লাগলো। এক সময় উনার ১০০ থেকে ১০০০ দলীল শেষ হয়ে গেলো তথাপি ইবলীসের বাতিল যুক্তি খ-ন করা গেলো না। নাঊযুবিল্লাহ!

তখন ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ভয় পেয়ে গেলেন যে, মহান আল্লাহ পাক না করুন, তিনি হয়ত ঈমানহারা হয়েই চলে যাবেন। এ অবস্থায় উনার একমাত্র ভরসা ছিলেন উনার শায়েখ হযরত নাজীবুদ্দিন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে উনার শায়েখ হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি যুহর নামাযের ওযূ করছিলেন। তিনি কাশফ অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখতে পেয়ে ওযূর পানি নিক্ষেপ করে বললেন, হে ফখরুদ্দীন! তুমি ইবলীসকে বলো, বিনা দলীলে মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। বহু দূর থেকে যখন শায়েখ উনার নিক্ষিপ্ত ওযূর পানি এসে উনার চেহারার উপর পড়লো এবং শায়েখ উনার ক্বওল মুবারকের আওয়াজ উনার কানে এসে পৌঁছলো তিনি তখন ইবলীসকে জানিয়ে দিলেন, হে ইবলীস! জেনে রাখ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। এটা আমি বিনা দলীলেই বিশ্বাস করি। তখন ইবলীস বললো, হে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি! আপনি আজকে আপনার শায়েখ উনার জন্য বেঁচে গেলেন। অন্যথায় আমি আপনাকে ঈমানহারা করে মৃত্যুমুখে পতিত করে চলে যেতাম। নাঊযুবিল্লাহ!

এদিকে মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নাজীবুদ্দীন কুবরা রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনাকে উনার খাদেম জিজ্ঞাসা করলেন যে, হুযূর! আজ বহুদিন আপনার খিদমতে আছি, সবসময় এক বদনা দিয়েই আপনার ওযূ সম্পন্ন হতে দেখেছি। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম দেখলাম। আপনি আরো যা করলেন, কখনও তো এমন দেখিনি! শায়েখ তিনি বললেন, হ্যাঁ! ঠিক বলেছো। তখন আমি দেখছিলাম ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইবলীসের সাথে বাহাছ করে হেরে যাচ্ছিলো প্রায়। তাঁর ঈমানহারা হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমতাবস্থায় তাঁকে ফায়েজ দিয়ে সে অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্যই এমন করতে হলো। সুবহানাল্লাহ!

ইতিহাসের এ মশহূর ঘটনা দ্বারা হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের নিকট বাইয়াত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও উনাদের ফায়িয-তাওয়াজ্জুহর বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। অতএব, হযরত নবী-রসূল আলাইহিস সালাম উনার উম্মত না হয়ে যেরূপ ইছলাহ ও নাজাত লাভ করা যায় না, তদ্রুপ কামিল শায়েখ উনার নিকট বাইয়াত না হওয়া পর্যন্ত ইছলাহ বা পরিশুদ্ধতা ও নাজাত লাভ করা যায় না। বরং শয়তানী প্রবঞ্চনায় পড়ে গোমরাহীতে নিপতিত হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন, হাজার দলীলেও কাজ হলো না ইবলীসের মুকাবিলায়। শেষপর্যন্ত, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি নাজাত পেলেন উনার শায়েখের উসীলায়। সুবহানাল্লাহ!!!

হক্ব আলিম, না হক্ব আলিম কে?

আলিম عالم শব্দটি বাবেسمع-يسمع থেকে উদ্ভূত। উক্ত শব্দটি اسم فاعل বা কর্তৃবাচক। ইহার لغة বা আভিধানিক অর্থ হলো একজন জ্ঞানী পুরুষ। আর اصطلاح বা পারিভাষিক অর্থে আলেম তাকে বলে, যিনি দ্বীনী ইলম তথা ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাসাউফ উনাদের অধিকারী। নিম্নে হক্কানী আলিম ও নাহক্ব আলিম সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন :

اِنَّمَا یَخْشِى اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا.

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার বান্দাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র আলেমগণই মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করেন। (পবিত্র সূরা ফাত্বির শরীফ ; পবিত্র আয়াত শরীফ নং ২৮)

মহান আল্লাহ পাক আরো তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

یَرْفَعُ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ ۙ وَ الَّذِیْنَ اُوْتُوْا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍ ؕ.

অর্থ: তোমাদের মধ্য থেকে যারা আলিম তাদেরকে মহান আল্লাহ পাক অনেক মর্যাদা দিয়েছেন। (পবিত্র সূরা মুজাদালাহ্ শরীফ ; পবিত্র আয়াত শরীফ নং ১১)

وَمَنْ يُّؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ اُوْتِىَ خَيْرًا كَثِيْرًا وَمَا يَذَّكَّرُ اِلَّا اُوْلُوْا الْاَلْبَابِ.

অর্থ: যে ব্যক্তিকে হিক্বমত বা বিশেষ ইলম দেয়া হয়েছে তাকে অনেক কল্যাণ দেয়া হয়েছে, অনেক ভালাই দেয়া হয়েছে এবং নিশ্চয়ই যারা সমঝদার আলিম তারা ব্যতীত কেউই নছীহত হাসিল করে না।

فَلَوْ لَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْتَةٍ مِنْهُمَ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوْا فِىْ الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوْا وَ رَمَهُمْ اِذَا رَجَعُوْا اِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُوْنَ.

অর্থ: কেন তোমাদের প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একটি দল বের হয় না দ্বীনি ইলম অর্জন করার জন্য। এবং সেই সম্প্রদায় যারা দ্বীনি ইলম হাসিল করার জন্য বের হবে এবং ইলম হাসিল করার পর তাদের সম্প্রদায়ে যারা থাকবে তাদের (গুনাহর ব্যাপারে) সতর্ক করবে যার ফলশ্রুতিতে তারা গুনাহ্ থেকে সতর্ক হয়ে যাবে।

আক্বাঈদের কিতাবে উল্লেখ আছে,

اِهَانَةُ الْعُلَمَاءِ كُفْرٌ.

অর্থ: আলিমগণকে ইহানত করা (তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা) করা কুফরী।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

اِنَّ اللّٰهَ يَبْعَثُ لِهٰذِهِ الْاُمَّةِ عَلٰى رَأْسِ كُلِّ مِأَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِيْنَهَا.

অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক এই উম্মতের হিদায়েতের জন্য প্রতি হিজরী শতকের শুরুতে কিংবা শেষে একজন মুজাদ্দিদ প্রেরণ করবেন যিনি দ্বীনের তাজদীদ বা সংস্কার করবেন। (আবূ দাউদ শরীফ)

হযরত ফারুকে আযম আলাইহিস সালাম তিনি হযরত কাব ইবনে আহবার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন-

مَنْ اَرْبَابُ الْعِلْمِ قَالَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ بِمَا يَعْلَمُوْنَ قَالَ فَمَا اَخْرَجَ الْعِلْمِ مِنْ قُلُبِ الْعُلَمَاءِ قَالَ الطَّمَعَ.

অর্থ: আলিম কে? হযরত কাব ইবনে আহবার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, যিনি অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করেন তিনিই আলিম। অতঃপর বলা হলো কোন জিনিস আলিমের অন্তর থেকে ইলমকে বের করে দেয়? তিনি বললেন, দুনিয়ার লোভ।

হযরত হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

انما افقيه الزاهد فى الدنيا والراغب فى الخرة والبصير بذئبه والمداوم على عبادة ربه والورع والكاف عن اعراض المسلمين والعفيف عن اموالهم والناصح لجماعتهم.

অর্থ: নিশ্চয়ই ফক্বীহ (হাক্বীক্বী আলিম) ঐ ব্যক্তি যিনি দুনিয়া থেকে বিরাগ পরকালের দিকে ঝুকে রয়েছেন, গুনাহ থেকে সতর্ক, সর্বদা ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল, পরহেযগার, মুসলমানের মান-সম্ভ্রম নষ্ট করেন না, তাদের সম্পদের প্রতি লোভ করেন না এবং অধিনস্ত লোকদেরকে নছীহত করেন।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

مَنْ ذَكَّرَكُمُ اللّٰهَ رُؤْيَتُه وَزَادَ فِىْ عِلْمِكُمْ مَنْطِقُه وَذَكَّرَكُمْ بِالْاخِرَةِ عَمَلُه.

অর্থ: যাঁকে দেখলে মহান আল্লাহ পাক উনার কথা স্মরণ হয়, যাঁর কথা বা নছীহত শুনলে দ্বীনি ইলম বৃদ্ধি হয় এবং যার আমল দেখলে পরকালের আমল করার জন্য আগ্রহ পয়দা হয়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন,

لَيْسَ الْعِلْمُ عَنْ كَثَرَةِ الْحَدِيْثِ وَ اِنَّ الْعِلْمَ مَنْ خَشْيَةِ اللّٰهِ.

অর্থ: অধিক হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারীই আলিম নয় বরং আলিম ঐ ব্যক্তি যিনি মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করেন।

نِعْمَ الْاَمِيْرُ عَلٰى بَابِ الْفَقِيرِ .

অর্থ: উত্তম আমির বা শাসক ঐ ব্যক্তি যে হক্কানী রব্বানী পীর-মাশায়িখ বা আলিমগণ উনাদের দরবারে যাতায়াত করে।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللّٰهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلّٰى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقِيْهٌ وَّاحِدٌ اَشَدُّ عَلٰى الشَّيْطَانِ مِنْ اَلْفِ عَابِدٍ

অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, একজন ফক্বীহ (হক্কানী আলিম) শয়তানের নিকট এক হাজার আবেদের চেয়েও বেশী ভয়ঙ্কর। (পবিত্র তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাযাহ্ শরীফ)

اِنَّ خَيْرَ الْخَيْرِ خِيَارُ الْعُلَمَاءِ

অর্থ: নিশ্চয়ই সর্বোৎকৃষ্ট আলেম হলো উলামায়ে হক্ব।

مَنْ صَلّٰى خَلْفَ عَالِمٍ فَكَانَّمَا صَلّٰى خَلْفَ نَبِىٍّ وَمَنْ صَلّٰى خَلَفَ نَبِىٍّ فَقَدْ غُفِرَ لَه.

অর্থ: যে ব্যক্তি কোন একজন হক্কানী রব্বানী আলিমের পিছনে নামায আদায় করলো সে যেন নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের পিছনেই নামায আদায় করলো। আর যে নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের পিছনে নামায আদায় করলো অবশ্যই তাকে ক্ষমা করা হবে। সুবহানাল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

Comments
سید محمد سعاد 6 w

Coments